নোবেল ও রবীন্দ্রনাথ – প্রথম পর্ব অমিতাভ বসু

চিঠি, চিঠি, চিঠি …

আঠেরোই নভেম্বর, উনিশশো তের। হেমন্তের সোনামাখা দিনটা গড়িয়ে কখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে এল। গ্রামের আকাশে গাছগাছালির মাথায় দিনের আলো মুছে দিয়ে ডানা মেলল রাতের কুয়াশা। পাকা রাস্তা পেছনে ফেলে একটা বড় গাড়ী বাঁক নিয়ে ঢুকে পড়ল গ্রামের কাঁচা রাস্তায়। এবড়োখেবড়ো পথ ধরে গাড়ী অত্যন্ত শ্লথগতিতে এগিয়ে চলল চেনা গন্তব্যের দিকে। সারাদিন গ্রামান্তরে বনে বনে অভিযান সেরে ঘরে ফিরছে সকলে। যাত্রীদের মুখ চেনা যায় না অন্ধকারে – ঠাহর করে দেখলে বোঝা যায়, চালক ছাড়া সবাই প্রায় কিশোর, সঙ্গে একজন ভিনদেশী অতিথি – আর চালকের পাশে ঘন দাড়ি-গোঁফের আড়ালে আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক দীর্ঘদেহী পুরুষ।
পথে পড়ল পাড়ার ডাকঘরটি। অন্ধকারে মুখ দেখা না গেলেও ও পাড়ার সবাই চেনে পুরুষটিকে, চেনে তাঁর গাড়িটাও! কাছাকাছি হতেই ডাকঘর থেকে তিরবেগে বেরিয়ে এল এক পত্রবাহক, চাপা উত্তেজনা তার চোখেমুখে! কোনমতে গাড়ী থামিয়ে ভদ্রলোকের হাতে সে ধরিয়ে দিল একটা টেলিগ্রাম। আপন চিন্তায় মগ্ন ছিলেন তিনি, আনমনে সেটা গুঁজে রাখলেন জোব্বার পকেটে। পত্রবাহক কিন্তু নাছোড়বান্দা, তার একান্ত অনুরোধ – তিনি যেন তক্ষুনি সেটা খুলে পড়েন। তার সেই উৎসাহ আর উত্তেজনার ছোঁয়াচ লাগল বুঝি অন্য যাত্রীদের মনেও; তারাও সমস্বরে যোগ দিল সেই অনুরোধে। অগত্যা উনি পকেটের চিঠিটা খুলে পড়লেন, সকলকে শুনিয়ে – মুখে ফুটে উঠল এক স্মিত হাসি। ওদিকে শ্রোতারা সব গর্বে আনন্দে আত্মহারা! অন্ধকার বনস্থলী মন্দ্রিত হল তাদের জয়ধ্বনিতে! টরেটক্কার সাঙ্কেতিক ভাষায় সাগরপার থেকে আসা ঐ লিপিটির মর্ম সে সম্যক বুঝুক বা না বুঝুক – সেদিনের সেই পত্রবাহক সর্বকালের বাঙ্গালী তথা ভারতীয়দের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দবার্তা বয়ে এনেছিল – ইতিহাস হয়তো কখনও তার নাম জানবে না!


উনিশশো তেরোর সাহিত্যে নোবেল-পুরস্কার পাবার খবরটি এমনি করেই পৌঁছেছিল রবীন্দ্রনাথের হাতে। সুইডেনে ১৯১৩ সালের ১৩ই নভেম্বর সুইডিশ একাডেমির নোবেল কমিটির ১৩জন সদস্যের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে তাঁকে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। বিশ্বসাহিত্যের উৎকর্ষ বিচারে এ-সম্মান বিশ্ববিশ্রুত। সেদিক থেকে ১৩ সংখ্যাটি আমাদের কাছে সৌভাগ্যসূচক বৈকি! আর আমরা আপামর বাঙ্গালিরা এই ঘটনায় যে একান্ত গর্বিত, সেকথা তো বলাই বাহুল্য!
মন বলল – “এ তো শুধু খবর, আর সালতারিখের কচকচি! সহজেই মেলে গুগুলের কল্যাণে। আর এ-খবর তো একে বস্তাপচা, তায় সর্বজনবিদিত; সেই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটবার দরকার কি এখন?” বুদ্ধিমান পাঠকও বুঝি সায় দেন সেকথায়। নিরুপায়ে লেখক শুধু কলম কামড়ান।
কলম বলে – “উঃ, লাগছে! ওহে অধৈর্য মন, ধৈর্যং রহু! খবর হয়ে ওঠার আগে আছে তার প্রস্তুতি। পুরনো কালের উপমায় ঐ যাকে বলে- পিদিম জ্বালানোর আগে সলতে পাকানো। আমার বলার কথাগুলো যদি একটুও বানানো হয় হোকনা, তার নাম গপ্পো – সেটা মুখরোচক করাটাই আমার কাজ।“ এই বলে কাগজের বুকে নতুন করে রেখা টেনে, কলম আবার নামল তার কাজে।

আমি কান পেতে রই

একেবারে শুরুতে পৌঁছতে হলে যেতে হবে অনেকটা উজানে। রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখতে শুরু করেন বছর তের বয়সে (আবার সেই তের!)। দাদা জ্যোতিরিন্দ্রের শিক্ষা ও সাহচর্যে, সুরের ছোঁয়ায় প্রথম যে কবিতাটি গান হয়ে উঠেছিল, সেটি হল – “গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে”- সেটিও লেখা হয়েছিল- হ্যাঁ, ঐ তের বছর বয়েসেই! এই সময়ের কিছু পরে আর একটি গানে সুর দিয়ে আর গেয়ে বাবাকে শুনিয়েছিলেন কিশোর রবি – “নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।“ গানটি শুনে দেবেন্দ্রনাথ কবিকে পুরস্কার দিয়েছিলেন এই বলে- “ দেশের রাজা যদি এ-গানের অর্থ বুঝত, তাহলে কবিকে সম্মান জানাত। তার যখন কোন সম্ভাবনা নেই, সেক্ষেত্রে আমাকেই সেকাজ করতে হবে।“


শান্তিনিকেতনের পৈতৃক জমিতে বিশ্বভারতী স্থাপনের স্বপ্ন তো কবির অনেক দিনের – প্রেরণা পেয়েছিলেন তাঁর বাবার কাছেই। আর সেই উদ্দেশ্যে একে একে সারা পৃথিবীর বহু গুণীজনকে তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন নানা বিষয়ে শিক্ষকতার জন্যে। অভূতপূর্ব সাড়াও মিলেছিল তাঁর সেই ডাকে। তাঁদেরই একজন ছিলেন ইংল্যান্ডের শিল্পী ও ভাস্কর উইলিয়ম রদেন্সটাইন।

এবার আমায় ডাকলে দূরে

রদেন্সটাইন শান্তিনিকেতন ছেড়ে দেশে ফিরে যাবার আগে রবীন্দ্রনাথকে বলে গেলেন – “আমি যখন তোমার স্কেচ করতাম বা মডেল গড়তাম, তুমি সবসময় ডেস্কে বসে কি-যেন লিখতে; উঁকি দিয়ে দেখে বুঝিনি তার এক বর্ণও, বুঝেছি যে সে তোমার নিজের ভাষায়। তোমার লেখার সুখ্যাতিও আমার কানে এসেছে। তাই ভাবছিলাম- এবার তুমি যখন লন্ডনে আসবে, যদি তোমার কিছু লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করে নিয়ে আস, তাহলে আমি ওখানে আমার বন্ধুদের ডেকে শোনাতে পারি, দেখব ওরা কী বলে। বিশেষত আমার একজন আইরিশ বন্ধুর কথা মনে হচ্ছে, তার নাম উইলিয়ম বাটলার ইয়েটস – সে-ও কবি – বোধহয় আগ্রহী হবে তোমার লেখায়।”

রদেন্সটাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, নিজের কয়েকটি গানের ইংরেজি অনুবাদ কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন এর আগেই; শিল্পীর একথায় হয়ত তাতে বাড়তি অনুপ্রেরণা যোগাল। সত্যিই যখন লন্ডনের উদ্দেশে জাহাজে চড়ে বসলেন কবি, খাতাখানি সঙ্গে নিলেন – যাত্রাপথের অবসরটুকু কাজে লাগাবার জন্যে। উনিশ দিনের চেষ্টায় খাতায় যোগ হল বেশ কয়েকটি গান আর কবিতার অনুবাদ।
১৬ই জুন, ১৯১২। যাত্রাশেষে লন্ডন পৌঁছেই কবির প্রথম কাজই হল খাতাখানি রদেন্সটাইনের হাতে তুলে দেওয়া। কথিত আছে, খাতাটি নাকি একবার খোয়া গিয়েছিল তারই মধ্যে, কোন হারান-প্রাপ্তির অফিসে পুনরাবির্ভাব হয়েছিল তার কিছুকালের মধ্যেই। সৌভাগ্যের কথা, সন্দেহ নেই! যাহোক, কথা রেখেছিলেন রদেন্সটাইনও – সমঝদার কয়েকজনকে বাড়ীতে ডেকে শুনিয়েছিলেন কবির অনূদিত গান আর কবিতাগুলি, পাঠ করেছিলেন ইয়েটস। তিনি ছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্টারজ মুর, মে সিনক্লেয়ার, এভেলিন আন্ডারহিল, আরনেস্ট রিস, চারলস ট্রেভেলিয়ান, এজরা পাউন্ড, এলিস মেনেল, হেনরি নেভিন্সন, চারলস এন্ড্রুজ, ও আরও কয়েকজন বোদ্ধা ব্যক্তি। সকলের কাছে গভীর সমাদর পেয়েছিল লেখাগুলি। আসর ভাঙল যখন, বিদায় নেবার বেলায় ইয়েটস কবির কাছে চেয়ে নিলেন তাঁর পাণ্ডুলিপিটি।
তারপরে শোনা যাক রদেন্সটাইনের নিজের কথায় –

“Yeats generously offered to write an introduction; he had previously gone carefully through the translations, respecting Tagore’s expressive English too much to do more than make slight changes here and there. Indeed, Yeats was as keen over the issue of the book of poems as he would have been over a selection of his own lovely verses. He wrote to me:
September 7, 1912 My dear Rothenstein,
… I sent the text and book to Tagore yesterday, and I expect my essay [Introduction to Gitanjali] back from my typist on Monday. I think I had better send it to you. You will, I think, find it emphatic enough. If you like it you can say so when you send it on to Tagore. In the first little chapter I have given what Indians have said to me about Tagore – their praise of him and their description of his life. What I am anxious about – some fact may be given wrongly, and yet, I don’t want anything crossed out by Tagore’s modesty.
I think it might be well if somebody compiled a sort of “Who’s Who” paragraph on Tagore, and put after the Introduction a string of dates, saying when he was born, when his chief works were published. My essay is an impression. I give no facts except those in the quoted conversation.
Yours,
W. B. Yeats”
[Quoted from “Men and Memories: Recollections of William Rothenstein”]

কবি ও শিল্পী – স্টারজ মুর


সেবার ইংল্যান্ডে ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বার্নাড শ’, এইচ জি ওয়েলস, স্টফোরড ব্রুক, জন মেস্ফিল্ড, লস ডিকিন্সন, বারট্রান্ড রাসেল, জন গলসওয়ারদি, রবার্ট ব্রিজেস, স্টারজ মুর, ও আরও কয়েকজন বিখ্যাত ইংরেজ লেখক ও শিল্পীর সাক্ষাত হয়। এঁদের মধ্যে স্টারজ মুর ছিলেন একাধারে কবি ও শিল্পী। ১৯১১ সালে তিনি ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচার-এ এক দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। নোবেল পুরস্কারের ব্যাপারে ইংল্যান্ডের স্বার্থের দিকে নজর রাখা ছিল এঁদের কাজ। ১৯১৩-র জানুয়ারিতে সেবছরের নোবেল পুরস্কারের জন্য রবীন্দ্রনাথের মনোনয়নপত্র ইংল্যান্ড থেকে স্টারজ মুর-ই সই করে পাঠান সুইডিশ একাডেমীতে। অবশ্য এতে ইয়েটসের উচ্ছ্বসিত সমর্থন তো ছিলই; সেইসঙ্গে সেদিন গলা মিলিয়েছিলেন কবি এনন্ড্রু ব্র্যাডলি, লিখেছিলেন –“এখন মনে হচ্ছে অবশেষে আবার আমাদের মধ্যে এক মহান কবির দেখা মিলল!”

একি গভীর বাণী এল

এর পরের ঘটনা তো বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক রঙিন স্বপ্ন বা রূপকথার সামিল। প্রাচ্যের কবির সেই আশ্চর্য কাব্যগাথা প্রতীচ্যের এক মরমী কবির মনে যে অনুরণন তুলেছিল, তার পরিচয় মেলে ইয়েটসের নিজের কথায় –


“দিনের পর দিন আমি এই অনুবাদগুলির পাণ্ডুলিপি আমার সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি, ট্রেনে বসে পড়েছি, কখনও বা দোতলা-বাসের ওপরে, কখনও রেস্তরাঁয় – আর অনেক সময় আমাকে এটা বন্ধ করতে হয়েছে, যাতে অপরিচিত কেউ না দেখে ফেলে এতে আমাকে কতখানি মুগ্ধ আর অভিভূত করেছে। এই কবিতাগুলি – আমার চেনা ভারতীয়রা আমায় বলেছে মূল কবিতাগুলি কত সূক্ষ্ম ছন্দপূর্ণ, বর্ণময়, আর মিলের অভিনবত্বে অনুবাদের অতীত – যে ভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে, তা আমি স্বপ্নে দেখেছি সারা জীবনভোর। এক মহত্তম কৃষ্টির ফসল হলেও এরা যেন তৃণ-গুল্মের মতই চিরচেনা মাটির সন্তান। একটি ঐতিহ্য – কবিতা আর ধর্ম যেখানে সমার্থক – শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সে বয়ে এসেছে শিক্ষিত আর অশিক্ষিতজনের আবেগ আর অলঙ্কার সযত্নে সংগ্রহ করে, আর সেইসঙ্গে অগণিত মানুষের কাছে ফিরিয়ে এনেছে বিদ্বান ও মহাপুরুষদের চিন্তাধারা। বাংলার সভ্যতা যদি অটুট অদমিত থাকে, যদি সেই তথাকথিত অনন্যসাধারণ মনের অধিকারী হয় সকলে, যদি তা আমাদের মত বহুভাগে খণ্ডখণ্ড হয়ে গিয়ে একে অপরের কাছে একান্ত অপরিচিত হয়ে না পড়ে, তবে কয়েকজন্মের মধ্যে এই কাব্যগুলির সূক্ষ্মতম ভাবও পথের ভিখারির কাছে পর্যন্ত ধরা দেবে।
… চসারের পূর্বসূরিদের মত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের কথার জন্যে সুর লেখেন, আর এটা প্রতিমুহূর্তে বোঝা যায় – তিনি তাঁর আবেগের প্রকাশে এত উচ্ছ্বসিত, এত স্বতঃস্ফূর্ত, এত অকুতোভয়, এবং এত বিস্ময়পূর্ণ, তার কারণ হল এই যে তাঁর সৃষ্টি কখনই অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, বা প্রতিপাদনের অপেক্ষাথী বলে মনে হয় না। এই কবিতাগুলি কক্ষনো ছোটো সুদৃশ্য ছাপা বইয়ে মহিলাদের টেবিলে শোভা পাবে না, যাতে তারা অলস-হাতে পাতা উলটে তাদের এতাবৎ পরিচিত অর্থহীন জীবনের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারে; কিংবা এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হাতে-হাতে ফেরার জন্যেও নয়, যাতে তারা কর্মজীবনের শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই এদের সরিয়ে রাখতে পারে। জন্মজন্মান্তর ধরে – পথিকেরা তাদের চলার পথে, মাঝিরা নদীতে নৌকা বাইবার অবকাশে গাইবে এই গান। প্রেমিকেরা একে অপরের জন্যে প্রতীক্ষার ফাঁকে যখন গুনগুন করবে এই গান, তখন দেখবে এই ঈশ্বরপ্রেমের গভীরে ডুব দিয়ে ওদের কামনা-বাসনা নবযৌবন লাভ করেছে। এই কবির হৃদয় প্রতি মুহূর্তে পৌঁছে গিয়েছে ওদের কাছে নির্দ্বিধায় এবং নির্বিচারে; আর ওদের জীবনের নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত সেই হৃদয় একথাও জানে, যে ওরা ওঁকে সহজেই বোঝে। ধূলার মলিনতা থেকে বাঁচতে গৈরিক-বসন-ধারী যে যাত্রী, আপন শয্যায় তার প্রেমিক রাজপুরুষের মালা-খসা ফুলের পাপড়ির সন্ধানরত যে মেয়েটি, শূন্যঘরে প্রভুর ফেরার প্রতীক্ষারত যে বধূ কিংবা সেবকটি – এরা সকলেই ঈশ্বর-সন্ধানী হৃদয়ের প্রতীক। ফুল আর নদী, শাঁখের আওয়াজ, শ্রাবনের বৃষ্টিধারা, অথবা খররৌদ্র – এরা মিলনে-বিরহে সেই হৃদয়েরই বিভিন্ন ভাবের দ্যোতক; আর নদীতে নৌকোয় বসে যিনি বংশী-বাদনরত, চীনে ছবিতে দেখা রহস্যপূর্ণ চরিত্রগুলির অন্যতম একজনের মত – তিনি ঈশ্বর স্বয়ং। একটি সম্পূর্ণ জাতিসত্তা, একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা – যা আমাদের কাছে একান্ত অপরিচিত – মনে হয় যেন এই কল্পনার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে; অথচ আমরা যে এতখানি অভিভূত হই, তা কিন্তু এরা অজানা বলেই নয়, এর মধ্যে আমরা নিজেদের প্রতিবিম্বই দেখি – যেন আমরা রসেত্তির কল্প-কাননে ঢুকে পড়েছি, কিংবা বুঝি স্বপ্নের মধ্যে আমাদের নিজেদের কণ্ঠস্বরই শুনতে পাচ্ছি – সাহিত্যের আসরে যা হয়ত এই সর্বপ্রথম।“
(ইংরেজি গীতাঞ্জলি-র ভূমিকায় ইয়েটসের মূল লেখা থেকে অংশবিশেষ, লেখকের অনুবাদে)

ইয়েটস ও গীতাঞ্জলির প্রথম সংস্করণ

পয়লা নভেম্বর ১৯১২তে গীতাঞ্জলির প্রথম প্রকাশনা করে ইন্ডিয়া সোসাইটি অব লন্ডন, তাঁর ১০৩টি কবিতার (মুখ্যত নৈবেদ্য, খেয়া, আর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থগুলি থেকে) ইংরেজি অনুবাদ, ইয়েটস-এর লেখা ভূমিকা, ও রদেন্সটাইনের আঁকা পেন্সিল-স্কেচ (প্রচ্ছদচিত্র) সহ; মাত্র ৭৫০টি কপি ছাপা হয়েছিল প্রথমে। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া জেগেছিল বিলেতের সাহিত্য-পাঠকদের মহলে। তারপরে জনপ্রিয়তার তাগিদ মেনে ম্যাকমিলান কম্পানি থেকে ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির নতুন প্রকাশ ঘটে। ততদিনে অবশ্য সুইডেনে নোবেল কমিটির হাতে পৌঁছে গেছে গীতাঞ্জলি।


১৯১৩-র নোবেল পুরস্কারের জন্যে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রস্তাবিত হয়েছিল মোট ২৮জন লেখকের নাম। রবীন্দ্রনাথের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ইংল্যান্ড থেকেই – টমাস হারডি, ঔপন্যাসিক হিসেবে যার খ্যাতি ‘ফার ফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউড’, ‘টেস অব দ্য ডি-আরবারভিল’ প্রভৃতি লেখার জন্য। সেই সঙ্গে স্পেন থেকে ছিলেন বেনিত পেরেজ গ্যালদস, ইতালিথেকে গ্রাতসিয়া দেলেড্ডা, সুইতজারল্যান্ড থেকে কার্ল স্পিট্টেলার, ফ্রান্স থেকে আনাতল ফ্রান্স ও অন্যান্যরা – তাছাড়াও ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সুইডেন আর বেলজিয়ামের প্রস্তাবিত প্রার্থীরা। পশ্চিম দুনিয়ার এতসব নামী দামী লেখকের ভিড়ে দূরদেশী অজ্ঞাত অখ্যাত গীতাঞ্জলির লেখক কোথায় হারিয়ে যাবেন, স্বাভাবিকভাবেই ছিল তার আশঙ্কা। তা যে হয়নি, তার থেকেই প্রমাণ হয় কতখানি সততা আর ঐকান্তিক নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন সেদিনের কমিটির সদস্যেরা, যাঁদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পুরস্কার-প্রাপকের যোগ্যতা বিচারের। সত্যিই তাঁরা প্রভূত প্রশংসার যোগ্য।


বাঙ্গালীর সৌভাগ্যক্রমে, আরও একটা ব্যাপার ঘটেছিল তখন। সুইডিশ অ্যাকাডেমির নোবেল কমিটিতে সেবছর এমন একজন ছিলেন, যিনি প্রাচ্যবিষয়ে জ্ঞানী – বাংলা বুঝতেন শুধু নয়, রবীন্দ্রনাথের কথাও আগেই জানতেন। তাঁর নাম ভারনার ভন হাইডেন্সটাম, তত্কালীন সুইডেনের বহু- প্রশংসিত কবি – ১৯১৬-তে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তিনিও। গীতাঞ্জলির বাণী অনুপ্রাণিত করেছিল তাঁর নিজের কবিতার ধারাকে। আপন স্বাধীন চিন্তা আর কলমের জোরে তিনি একটি বিশেষ রচনায় গীতাঞ্জলির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে সেটি কমিটিতে তাঁর সহকারীদের পাঠান। তাঁর চিন্তাধারা কার্যকরী হয়েছিল খুবই; বিশেষত তাঁর রচনার মাধ্যমে তিনি আগেকার কয়েক বছরের মনোনয়ন নিয়ে যে সমালোচনা চলছিল, তারও উল্লেখ করেন। নব্যযুগের লেখকদের মধ্যে আরও এক জন গলা মেলান তাঁর সাথে। – (http://authorscalendar.info/heidenst.htm)

সুইডিশ কবিভারনার ভন হাইডেন্সটাম

বিভিন্ন অধ্যাপক, ধর্মযাজক, অবসৃত কবি, ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের দ্বারা গঠিত নোবেল কমিটির সব সদস্যদের মধ্যে এই দুজনই মাত্র ছিলেন সমকালীন নবীন সাহিত্যসেবক। তাঁদের কথা আর মতের গুরুত্ব ছিল খুবই। ক্রমশ কমিটিভুক্ত আরও অনেকেই গীতাঞ্জলি পড়া শুরু করেন, এবং ধীরে ধীরে তার কাব্যরসে ও বাণীতে মুগ্ধ হন। গীতাঞ্জলির ঐ স্বল্প-পরিসরেই রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক কাব্যপ্রতিভার পরিচয় পেয়েছিলেন তাঁরা, গোষ্পদের পরিসরে আকাশ চেনার মতই! সেটা তাঁদের দুর্লভ ক্ষমতা। তারপরে ঘটে আর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কমিটির প্রাথমিক সুপারিশ ছিল যার নামে, সেই এমিল ফাগে (ফরাসী লেখক) অ্যাকাডেমির সিদ্ধান্তে বাতিল হয়ে যান। ফলস্বরূপ, নভেম্বরের ১৩ তারিখে যে ১৩জন সদস্য ভোট দেন, তাঁদের মধ্যে ১২ জনই দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে।
দশই ডিসেম্বর, ১৯১৩ ছিল পুরস্কার দানের অনুষ্ঠান। সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন নি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর অক্ষমতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি একটি টেলিগ্রাম পাঠান –

“I beg to convey to the Swedish Academy my grateful appreciation of the breadth of understanding which has brought the distance near, and has made a stranger a brother.” (স্বতঃই মনে করিয়ে দেয় তাঁর সেই চেনা গানের ভাষা – “… দূরকে করিলে নিকট বন্ধু, পরকে করিলে ভাই।”)

অভিমানের বদলে আজ

হারমোনিয়াম সহযোগে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনে দেবব্রত বিশ্বাস

এর মাঝে ঘটেছিল একটি দুঃখব্যঞ্জক ঘটনা। সেটি সম্বন্ধে এবার শুনব যার মুখে, তিনি হলেন  আমাদের সবার পরিচিত, রবীন্দ্রসঙ্গীতের  সর্বজনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী এবং বর্তমান গল্পকার  শ্রী দেবব্রত বিশ্বাস। গান পরিবেশনে ও গায়কীতে তিনি এক অনন্য প্রতিভা। নিজস্ব অভিজ্ঞতায় জানি, গানের পর গানে ভাবের পারম্পর্য রচনা করে শ্রোতাদের তিনি উত্তীর্ণ করতেন এক অপরূপ বোধের জগতে। সেদিন নেহাতই মুডে ছিলেন তিনি। এক ঘরোয়া গানের আসরে গান গাইতে বসেছিলেন – অভ্যাস মত কোলের ওপর হারমোনিয়ামটাকে তেরচা করে টেনে নিয়ে। প্রথমে ধরলেন “পুরানো জানিয়া চেয়ো না আমারে আধেক আঁখির কোণে”; তার পর ধরলেন- “এ মণিহার আমায় নাহি সাজে”। গানটি শেষ করে, হারমোনিয়াম থামিয়ে বললেন- “এই গানটি সম্বন্ধে একটা ভারী সুন্দর গল্প প্রচলিত আছে, আপনারা যদি শুনতে চান তো…” কথা শেষ হবার আগেই উৎসুক শ্রোতারা বলে উঠলেন- “বলুন, বলুন, নিশ্চয়ই!” উনি একটু হেসে বললেন- “গানটির মজার গল্পটি হচ্ছে – রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল প্রাইজ পেলেন, তখনই আমাদের বাংলাদেশের লোকেরা জানতে পারলেন যে রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ-ই! তার আগে রবীন্দ্রনাথ ততখানি স্বীকৃতি পাননি। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পরে কলকাতা থেকে কয়েকজন সাহিত্যিক, আরও কিছু গুণী গুণী লোক সব, তাঁরা গেলেন শান্তিনিকেতনে – অভিনন্দন জানাতে রবীন্দ্রনাথকে। সেইসময়ে তাঁর খুব অভিমান হয়েছিল। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পরে উনি যে একটা স্বীকৃতি পেলেন, তার আগে কেউ তাঁকে পাত্তাই দিত না – এইটাই তাঁর অভিমানের কারণ। এবং তার পরে, তাঁর একজন প্রিয় বউদিদি ছিলেন, তাঁকে তিনি এই গানটা তৈরী করে শুনিয়েছিলেন। এই পর্যন্ত জানি, গল্পটা অবশ্য সত্যি কিনা বলতে পারবো না, এইটা আমরা ছোটবেলায় শুনেছি।”

হ্যাঁ, গল্পটা আগাগোড়া সত্যি! রবীন্দ্রনাথের অভিমান হয়েছিল বৈকি, মর্মান্তিক অভিমান। স্বভাবতই  সংবেদনশীল কবি সেই কৃত্রিম আর লোকদেখানো অভ্যর্থনার প্রহসন সইতে পারেন নি। তাঁদের সেই অভিনন্দনের উত্তরে এক বক্তৃতায় কবি বলেছিলেন –

“আজ আমাকে সমস্ত দেশের নামে আপনারা যে সম্মান দিতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তা অসঙ্কোচে সম্পূর্ণ ভাবে গ্রহণ করি এমন সাধ্য আমার নেই। …কবি-বিশেষের কাব্যে কেউ বা আনন্দ পান, কেউ বা উদাসীন থাকেন, কারো বা তাতে আঘাত লাগে এবং তাঁরা আঘাত দেন। আমার কাব্য সম্বন্ধেও এই স্বভাবের নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম হয়নি, একথা আমার এবং আপনাদের জানা আছে। দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও দুর্নাম আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমাণ নিতান্ত অল্প হয়নি এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি। এমন সময় কি জন্য যে বিদেশ হতে আমি সম্মান লাভ করলুম তা এখনও পর্যন্ত আমি নিজেই ভাল করে উপলব্ধি করতে পারিনি। …যাই হোক, যে কারণেই হোক, আজ  য়ুরোপে আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন। তার যদি কোন মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুণীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে। আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনও আন্তরিক সম্বন্ধ নেই। নোবেল প্রাইজের দ্বারা কোন রচনার গুণ বা রস বৃদ্ধি করতে পারে না। …তাই আমি আপনাদের কাছে করজোড়ে জানাচ্ছি, – যা সত্য তা কঠিন হলেও আমি মাথায় করে নেব, কিন্তু যা সাময়িক উত্তেজনার মায়া, তা আমি স্বীকার করে নিতে অক্ষম। …সাধারণের কাছ থেকে নূতন সম্মানলাভের কোন যোগ্যতা আমি নূতন রূপে প্রকাশ করেছি একথা বলা অসঙ্গত হবে। …যিনি প্রসন্ন হলে অসম্মানের প্রত্যেক কাঁটাটি ফুল হয়ে ফোটে … তাঁরই কাছে আজ আমি এই প্রার্থনা জানাচ্ছি – তিনি এই আকস্মিক সম্মানের প্রবল অভিঘাত থেকে …আমাকে নিভৃতে রক্ষা করুন।“ (সংক্ষিপ্ত অংশবিশেষ)

সবারে করি আহ্বান

এর বেশ কিছুদিন পরে, ১৯২১এ, রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন সুইডেনে। সেদিন তিনি পেয়েছিলেন  বিপুল সম্বর্ধনা – সুইডেনের রাজা গুস্টাভ স্বয়ং স্বাগত জানিয়েছিলেন তাঁকে, স্কুলের ছেলেমেয়েরা গান করেছিল তাঁকে সম্মান জানিয়ে, উৎসাহী শ্রোতারা সমবেত হয়েছিলেন ওঁর বক্তৃতা শোনার জন্যে, সবশেষে সায়মাশের বিপুল আয়োজন করা হয়েছিল তাঁর সম্মানার্থে। একজন বিশিষ্ট সাহিত্য-সাংবাদিক, গানার আলস্ট্রম, উপস্থিত ছিলেন সেখানে; তাঁর ভাষায় –

“The honored guest’s hair and beard had had time to turn white and his work, which had reached a vast output and was by now more fully translated, was even more impressive than on that happy day in 1913 when he had won the Nobel Prize.”

সেই বিপুল ও আন্তরিক সম্বর্ধনার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেন –

“I am glad that I have been able to come at last to your country and that I may use this opportunity to express my gratitude to you for the honour you have done to me by acknowledging my work and rewarding me by giving me the Nobel Prize. I remember the afternoon when I received the cablegram …I was staying then at the school Shantiniketan, about which I suppose you know. …You can well understand how rejoicing it was for my boys at the school and for the teachers. What touched me more deeply than anything else was that these boys who loved me and for whom I had the deepest love felt proud of the honour. …When I was about 25 years I used to live in utmost seclusion in the solitude of an obscure Bengal village by the river Ganges in a boathouse….And then came a time when my heart felt a longing to come out of that solitude and to do some work for my human fellow-beings, …to give expression to my ideas through some definite work, some definitive service…and the one thing, the one work, which came to my mind, was to teach children….The vigour and the joy of children, their chats and songs filled the air with a spirit of delight, which I drank every day…it symbolized …the whole cry of human life, all expressions of joy and aspirations of men rising from the heart of Humanity up to this sky. I could see that, and I knew that we also, the grown-up children, send up our cries of aspiration to the Infinite. I felt it in my heart of hearts. In this environment, I used to write my poems Gitanjali, and I sang them to myself in the midnight under the glorious stars of the Indian sky. And in the early morning and in the afternoon glow of sunset I used to write these songs till a day came when I felt impelled to come out once again and meet the heart of the large world. And I felt a great desire to come out and come into touch with the Humanity of the West, for I was conscious that the present age belongs to the Western man with his superabundance of energy. …And so I came out. After my Gitanjali poems had been written in Bengali I translated these poems into English, without having any desire to have them published, being diffident of my mastery of that language, but I had the manuscript with me when I came out to the West. And you know that the British public …approved of them. I was accepted, and the heart of the West opened without delay. …I know that I must not accept that praise as my individual share. It is the East in me, which gave to the West. …I can assure you that the prize which you have awarded to me, was not wasted upon myself. I as an individual had no right to accept it, and therefore I have made use of it for others…. I have used this money… for establishing and maintaining the University which I started lately, …where Western and Eastern students could meet and share the common feast of spiritual food. And thus I am proud to say that your awarding me the prize has made some contribution to this great object, which I had in my mind. This has made me come once again to the West, …to invite you to the feast waiting for you in the East. …I have visited different countries of Europe, and I have accepted from them an enthusiastic welcome. That welcome has its own meaning, that the West has need of the East, as the East has need of the West, and so the time has come when they should meet. I am glad I belong to this great time, this great age, and I am glad that I have done some work to give expression to this great age, when the East and the West are coming together. They have got their invitation to join hands in building up a new civilization and the great culture of the future.

I feel certain that through my writing, some such idea has reached you, even if obscurely through the translation, some idea that belongs both to the East and the West, some idea which proceeding from the East …has been accepted by the West. I am thankful to God that he has given me this great opportunity, that I have been an instrument to…unite the hearts of East and West. And I must to the end of my life carry on that mission. I must do all that I can. …The spirit of India has always proclaimed the ideal of unity. …Man is not to fight with other human races, other human individuals, but his work is to bring about reconciliation and Peace and to restore the bonds of friendship and love. For that great mission of India, I have started this university. I ask you now …to come and join hands with us and let your students and learned men come and help us to make this a common institution for the East and the West. May we all together make it living and representative of the undivided Humanity of the world. For this I have come to you. I ask you …in the name of the unity of men, in the name of love, and in the name of God to come. I invite you.”      (Excerpts from Tagore’s acceptance speech, 26 May, 1921, Stockholm)

বিস্ময়ে তাই জাগে

স্টকহোমে নোবেল মিউজিয়াম আর নোবেল কমিটির অফিস নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। বাড়ীটা এমনকিছু বড় নয় – অন্তত এই বাড়াবাড়ির দেশ আমেরিকায় আমার এতাবৎ একান্ত  অভ্যস্ত চোখে। নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে নানা জিনিস দেখা হল, জোগাড় করা গেল নানা তথ্য, একটা বড় হলঘরে বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল-প্রাপকদের ছবি আর গল্প থেকে জানা গেল খুঁটিনাটি নানান খবর।  বেশির ভাগ প্রাপকই ধুরন্ধর বিজ্ঞানী বলে বিখ্যাত, রসায়নে কিংবা পদার্থবিদ্যায় পুরস্কার পেয়েছেন। খ্যাপার মত খুঁজে ফিরলাম রবিঠাকুরের নাম, কোথাও মিলল না সেই পরশপাথর! সাহিত্যের কোনও রথীমহারথীরই দেখা মিলল না কোন দেয়ালেই, হয়ত তাঁরা লুকিয়ে আছেন অন্য কোথাও। যাহোক, প্রমাণিত প্রতিভার এহেন মিছিল দেখে যখন মাথার মধ্যে  তাজ্ঝিম–মাজ্ঝিম অবস্থা, মনটা ভার-ভার, গলাটাও এসেছে একেবারে শুকিয়ে – তখন আধজানা কি অচেনা তথ্য আর তত্ত্বের  খোঁজ ছেড়ে চললাম  চিরচেনা কফির খোঁজে। রিসেপসন-ডেস্কের পাশ কাটিয়ে  ডাইনে ঘুরতেই ক্যাফেটেরিয়ার দেখা মিলল। কফি গলায় ঢেলে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বড় চত্বরটার দিকে আবার ফিরে যেতে গিয়ে দেখি, বাঁদিকে একটা অন্ধকার ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভেসে আসছে একটু আলো আর অনেকটা আওয়াজ। ঘরটা খুব বড় নয় – উঁকি মেরে বুঝলাম সেটা অডিটোরিয়াম। নিঃশব্দে ঢুকে পড়লাম সেখানে –  পথক্লান্ত শরীরটা বিশ্রামের আশায় গা ঢেলে দিল নরম সীটে, আর বেচারা পা দুটোও যেন হাঁপ ছেড়ে ধন্যবাদ জানাল আপন মনেই!    

পর্দায় চোখ পড়তে দেখি, সেখানে সমস্ত দেয়ালটা জুড়ে চোখ-জুড়নো ঘনসবুজ ঘাসের লন – একজন মালী বসে কাজ করছে তার এক কোণায়। ভাষ্যকারের মুখে জানা গেল এসে পড়েছি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার পরের সিনে ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বহু পুরনো একটা বাড়ীর আইভিতে ঢাকা দেওয়াল। কয়েকধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে বিরাট দেউড়ি দিয়ে ঢোকার পর চোখে পড়ে এক মস্ত রসায়ন ল্যাবরেটরি বা গবেষণাগার। বুঝলাম নোবেলজয়ী কোন দিকপাল রাসায়নিকের জীবনগাথা গাঁথা পড়েছে সেলুলয়েডে। এমনিভাবে পরদায় পরপর দেখা মিলল সারা পৃথিবীর আরও কিছু জ্ঞানী গুণীদের সঙ্গে – রয়ে গেল স্বল্প-পরিচয়ের দূরত্ব। চোখদুটো ইতিমধ্যে ক্লান্তিতে প্রায় আধবোজা, কিন্তু তা হলে কি হয় – মন বলল “ওঠো হে, আরও ঢের ঘোরা বাকি!” নিতান্ত নারাজ পদযুগলকে কোনমতে জাগিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি সবে, পাশ থেকে অনিন্দিতা হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিয়ে বলল – “দেখ কী দেখাচ্ছে!” দেখব কী, ততক্ষণে কানে পৌঁছেছে চিরচেনা গানের কথা আর সুর – “খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল…” সবিস্ময়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে পর্দায় তাকিয়ে দেখি শান্তিনিকেতনের পরিচিত পরিবেশ, আশ্রমের পথ বেয়ে গান গেয়ে এগিয়ে চলেছে ছাত্রছাত্রীর দল বসন্ত-বন্দনায়। বসা দূরের কথা, আমার তো তখন তুড়িলাফ দেবার অবস্থা! খ্যাপা যেন অবশেষে সত্যিই খুঁজে পেয়েছে পরশপাথর! চকিত বিস্ময় ধাতস্থ হতে যেটুকু সময় লাগল, তার মধ্যে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে পর্দায় চলতে লাগল রবীন্দ্রনাথের জীবন আর কাজের আলোচনা, আর সেইসঙ্গে শান্তিনিকেতনের কর্মব্যস্ত দিনের টুকরো ছবি। আশ্রমের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনও এই ডকুমেন্টারিতে স্থান পেয়েছে। সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা বৈকি! নতুন উৎসাহে অডিটোরিয়ামের বাইরে পা দিয়ে দেখি এককোণে এক তরুণীকে ঘিরে ছোটখাটো একটি জটলা। সেদিকে এগোলাম কৌতূহলবশে। মেয়েটি নোবেল মিউজিয়মের এক কর্মী, নোবেলের ইতিহাস এবং কমিটির কার্যকলাপ সম্বন্ধে তথ্য পরিবেশন করছে সে নানা ঘটনার বর্ণনা ও গল্পের মাধ্যমে। তার কাছেই জানা গেল, নোবেলের প্রাথমিক পর্বে অর্থনীতির কোন পুরস্কারের কথা ছিল না। অর্থনীতির পুরস্কারটি সুইডিশ অর্থসংস্থা তথা ব্যাঙ্কের অবদান। সেইসূত্রে ঐ বিষয়ে প্রাপকের মনোনয়নে নোবেল কমিটি তাদের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর নোবেল লরিয়েটদের নিয়ে এক জাঁকজমকপূর্ণ ডিনারের আয়োজন করা হয়, তার সচিত্র বিবরণও পাওয়া গেল মেয়েটির কাছে। বক্তব্য শেষ করে সে একটি বাক্স থেকে বার করে আমাদের দেখাল নোবেল পুরস্কারের স্মারক সেই বহুবাঞ্ছিত স্বর্ণপদক। পদকটি ছুঁয়ে যেন ধন্য হলাম – গায়ে জাগল রোমাঞ্চ! সমবেত দর্শকদের হাতে হাতে ঘুরে পদকটি যথাবিহিত ফিরে গেল আবার মেয়েটির হাতে। সবশেষে এল প্রশ্নোত্তরের পালা। আমার মনে তো সর্বদাই থাকে একরাশ প্রশ্নের জটলা। সুযোগ মিলতেই মেয়েটির দিকে ছুঁড়লাম তারই একটিঃ “সারা পৃথিবীতে যত ভাষা আছে, তাদের পড়া আর বোঝার ক্ষমতা কি নোবেল কমিটির সদস্যদের আয়ত্তের মধ্যে – নাহলে সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের মূল্যায়ন তাঁরা করেন কীভাবে?” উত্তরে মেয়েটি বলল- “এখনও বিশ্বের সবকটি স্বীকৃত ভাষায় বিদগ্ধ বিচারক নোবেল কমিটিতে নেই; সেটা তাঁরা করেন মূলত অনুবাদের মাধ্যমে। তাও, যে কোনও অনুবাদক হলেই হবে না – তাঁকে কমিটির অনুমোদিত হতে হবে। অবশ্য মূল লেখক যদি নিজের লেখা অনুবাদ করে দেন, তাহলে তো কোনও কথাই নেই!” আমি বললাম -“আমার দেশের একজন সাহিত্যিকই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তিনিও তাই করেছিলেন বটে!” মেয়েটি বুদ্ধিমতী, আমার চেহারা দেখে আমার জন্মভূমি অনুমান করতে ভুল হয়নি তার; তাই একটু হেসে বলল -“তোমাদের কবি টেগোরের কথা আমি জানি –পড়েছি ওঁর কবিতা, ভাল লেগেছে – খুব স্পিরিচুয়াল।“ একটু উদাস চোখে তার পরে বলল- “এই দেখ না, আমার একজন প্রিয় কবি আছে, কিন্তু আমি বেশ জানি সে কোনদিন নোবেল পাবে না।“ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-“ কেন?” ও বলল-“কোনও ভাল অনুবাদ নেই বলে।“ “কেন, তার লেখা তোমার যখন এত প্রিয়, তুমিই অনুবাদ করনা।“ আমি না বলেই পারলাম না। সে করুণ হেসে বলল -“তা হবে না; আমার যে অনুমোদন নেই!” কথার শেষে জানলাম মেয়েটি ক্রোয়েশিয়ার।


তোমার ভাষা বোঝার আশা

ঐ মেয়েটির আক্ষেপ আমি বেশ বুঝতে পারি। উৎকৃষ্ট এবং অনুমোদন-ধন্য অনুবাদের অভাবে পৃথিবীশুদ্ধু অনেক প্রথম সারির লেখকই নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবেন – বাংলা-সাহিত্যে যেমন হয়েছেন শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর প্রমুখ কয়েকজন। সহানুভূতি জানিয়ে বিদায় নিলাম মেয়েটির কাছে – সহমর্মিতার সূত্রে সেই মুহূর্তে যেন অজান্তে বাঁধা পড়লাম আমরা দুজনে। 

রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুবাদ নিয়ে তর্ক চলে এখনও; কানে এসেছে অনেকের সুচিন্তিত অভিমত- “ভাল হয়নি।” ইংরেজি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের সম্যক জ্ঞান সম্বন্ধে আমার অন্তত সন্দেহের অবকাশ নেই কোন। তাঁর অন্যান্য ইংরেজি লেখা, বিশেষত “crisis in civilization” (সভ্যতার সঙ্কট) অথবা নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের চিঠিটি পড়লে এবং বুঝতে পারলে সে-ব্যাপারে সন্দেহ থাকে না। আর লেখার মানবিচারে তাতেই কিন্তু উনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন – নোবেল কমিটির সদস্যরা স্বয়ং সেধরণের কোন প্রশ্ন আদপেই তোলেননি! তাঁর লেখার স্বরূপ বুঝে নিতে অসুবিধে হয়নি কোনও তৎকালীন কমিটির সদস্য তথা প্রকৃত গুণগ্রাহী মহলের। সুইডিশ অ্যাকাডেমির ভাষায় রবীন্দ্রনাথ এই পুরস্কারের যোগ্য –

“… because of his profoundly sensitive, fresh, and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West.”

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান হ্যারাল্ড হিয়ারনে তাঁর অভিভাষণের শুরুতে সেদিন বলেছিলেন-

“In awarding the Nobel Prize for Literature to the Anglo-Indian poet, Rabindranath Tagore, the Academy has found itself in the happy position of being able to accord this recognition to an author who, in conformity with the express wording of Alfred Nobel’s last will and testament, had “during the current year” written the finest poems “of an idealistic tendency.” Moreover, after exhaustive and conscientious deliberation, having concluded that these poems of his most nearly approach the prescribed standard, the Academy thought that there was no reason to hesitate because the poet’s name was still comparatively unknown in Europe, due to the distant location of his home. There was even less reason since the founder of the Prize laid it down in set terms as his “express wish and desire that, in the awarding of the Prize, no consideration should be paid to the nationality to which any proposed candidate might belong.”

সাহিত্যের মতন একটি বিষয়ে, যেখানে লেখা বা লেখকের মানবিচারে কোনও পরিসংখ্যানগত হিসেব চলে না, সেখানে সুইডিশ কমিটির এই বিচারক-গোষ্ঠীর অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টির ভূয়সী প্রশংসা অবশ্যই প্রাপ্য। বিদেশি হলেও, রবীন্দ্রনাথের লেখায় ভাবের গভীরতা ও ভাষার বর্ণচ্ছটা দুই-ই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন তাঁরা। মিঃ হিয়ারনে তাঁর ভাষণের এক অংশে তাই বলেছেন –

“This very seeking of his to discover the true relation between faith and thought makes Tagore stand out as a poet of rich endowment, characterized by his great profundity of thought, but most of all by his warmth of feeling and by the moving power of his figurative language. Seldom indeed in the realm of imaginative literature are attained so great a range of note and of color, capable of expressing with equal harmony and grace the emotions of every mood from the longing of the soul after eternity to the joyous merriment prompted by the innocent child at play. Concerning our understanding of this poetry, by no means exotic but truly universally human in character, the future will probably add to what we know now. We do know, however, that the poet’s motivation extends to the effort of reconciling two spheres of civilization widely separated, which above all is the characteristic mark of our present epoch and constitutes its most important task and problem.”

রবীন্দ্রনাথের ভাষা সম্বন্ধে তিনি বলেন-

“… his rhythmically balanced style, that, to quote an English critic’s opinion, “combines at once the feminine grace of poetry with the virile power of prose”; his austere, by some termed classic, taste in the choice of words and his use of the other elements of expression in a borrowed tongue – those features, in short, that stamp an original work as such, but which at the same time render more difficult its reproduction in another language.”

উক্ত বক্তব্যে স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথের অনুবাদের ভাষার প্রশংসা আছে, নেই কোনও অন্যায় অনুযোগ! আর এই প্রশংসার সামনে যে কোনও অর্বাচীন সমালোচনা স্বতঃই ম্লান হয়ে পড়ে – অন্তত আমার চোখে।

সমালোচনা কথাটা সম্পর্কে আমার নিজের সূক্ষ্ম একটা আপত্তি আছে। সমানে সমানে আলোচনা হলে তবেই সেটা হওয়া উচিত “সমালোচনা” – নইলে সেটা দাঁড়ায় বিষম-আলোচনায়! এই বিষম- আলোচনার শিকার অবশ্য হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ প্রায় সারাজীবনই। সে অন্যায় তিনি অন্যান্য দুঃখের পাশে পাশেই মেনেও নিয়েছেন সারাজীবন – একলাই নিজের মনের আলো হাতে বেরিয়েছেন সত্যের সন্ধানে। কল্লোলযুগে কিছু তরুণ বাঙালী সাহিত্যিক তৎকালীন বাংলা-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের একচ্ছত্র আধিপত্যে অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্রোহ জানিয়েছিল কাজে আর কথায়। সেই তাঁরাই একটু পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথের শুধু শ্রেষ্ঠত্ব নয়, শিষ্যত্বও মেনে নিয়েছিলেন সজ্ঞানে ও সানন্দে! নিন্দার ভার তিনি নীলকণ্ঠের মত তুলে নিয়েছিলেন নিজের গলায়, বিনিময়ে বিশ্বের দরবারে বাংলা সাহিত্যকে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে বাংলা-মায়ের গলায় তুলে দিয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ স্বর্ণাভরণ। সেদিনের সর্ব-অর্থে নবীন কবি বিষ্ণু দে, যার মধ্যে ‘যথার্থই নতুন পথ খননের অধ্যবসায়’ দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তাই শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছিলেন সেই পঞ্চাশের দশকে –

 “তোমার আকাশ দাও, কবি, দাও/ দীর্ঘ আশি বছরের/আমাদের ক্ষীয়মাণ মানসে ছড়াও/সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আশি বছরের আলো,/বহুধা কীর্তিতে শত শিল্পকর্মে উন্মুক্ত উধাও/ তোমার কীর্তিতে আর তোমাতে যা দিকে দিকে একাগ্র মহৎ,/সে কঠিন ব্রতের গৌরবে,/শুনি যেন সুন্দরের গান/দেখি যেন একনিষ্ঠ দীর্ঘায়ুর প্রগতির এক ছবি,/…আমাদের দিনের পাপড়িতে, জীবনের ফুলে ফলে/ভ্রমর গুঞ্জনে নব পল্লব মর্মরে /গড়ে তুলি আজ কাল, মাসে মাস, শত বর্ষ পরে/আমাদের প্রতিদিন, কবি।“

গত একশ পঞ্চাশ বছরের বাংলার ইতিহাসে রবিদীপ্তি এখনও অম্লান। বছর কয়েক আগে একবার আলাপ হয়েছিল বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষের সঙ্গে। গল্পচ্ছলে পার্থদা মৃদু অনুযোগ জানালেন – “দেশের তরুণদের মধ্যে এখন নতুন করে কথা উঠেছে – রবীন্দ্রনাথ কি বাঙ্গালীর জীবনে এখনও প্রাসঙ্গিক?” এখনও বেশ মনে আছে, অধৈর্য উত্তেজনায় আমি বলে উঠেছিলাম – “আপনি ওদের প্রতিপ্রশ্ন করতে পারেন – তোমাদের জীবনে বেঁচে থাকতে অক্সিজেন কি একান্ত প্রাসঙ্গিক?” কিছুটা অনধিকারচর্চায় লজ্জিত হয়েছিলাম তক্ষুনি। পার্থদা অবশ্য খুব হেসে তারিফ করেছিলেন মন্তব্যটার!

অনুবাদের প্রসঙ্গেই ফিরে আসি আবার। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে, বিশেষত পশ্চিমী-দুনিয়ায় সেদিন গীতাঞ্জলি যে সাড়া তুলেছিল তা এক কথায় অভূতপূর্ব! নোবেল পাওয়ার পর থেকেই নানা ভাষায় গীতাঞ্জলির অনুবাদ করার ব্যাপারে যেন কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল বিশ্বব্যাপী। নানা দেশের সাহিত্যের রথী-মহারথীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন সে-প্রচেষ্টায় – ফ্রান্সের আন্দ্রে জিদ, জাপানের ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, রাশিয়ার আনা আখমাটভা, প্রভৃতি।

কয়েকজন নোবেল-প্রাপ্ত লেখকও রয়েছেন এই তালিকায়। বিভিন্ন কারণে গীতাঞ্জলি তাঁদের ভাল লেগেছিল সেদিন, তার সপ্রশংস উল্লেখও করেছেন তাঁরা সেইসব অনুবাদ-গ্রন্থের ভূমিকায়। তাঁদের সেই অকৃত্রিম ভাল-লাগা স্বীকার করে নিয়েও বলি, রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত অনুবাদ একমাত্র বাঙালী-মননেই সম্ভব –এ আমার এক নিজস্ব মত। কেননা, অনুবাদ ব্যাপারটা স্রেফ ভাষান্তর নয়, তার চেয়ে অনেক গভীরতর। শুধুমাত্র বাংলা ভাষাটা ভালভাবে শেখাটাই যথেষ্ট নয়; তাঁর লেখার অন্তর্গত ভাবের মর্ম বুঝতে হবে আগে, তারপরে তাতে ভাষা দেওয়া। নইলে অনেকসময় ফল হয় শোচনীয় বা হাস্যকর! হাতের কাছেই আছে এর এক চরম উদাহরণ।

রবীন্দ্রনাথের গানের গভীরে প্রবেশ করলে উপলব্ধি করা যায়, মানুষের মনে যতরকম বিচিত্র ভাবের আবির্ভাব হতে পারে, তাদের সবার মুখেই তিনি যে শুধু ভাষা দিয়েছেন, তাই-ই নয়, তাতে সুরারোপ করে অপূর্ব গানের পরে গান রচনা করেছেন। বাঙ্গালী-মনের একটি ভাবের সঙ্গে বাঙ্গালিমাত্রেই পরিচিত – তার নাম অভিমান। ইংরেজি তথা পশ্চিমী অভিধানে তার আক্ষরিক অনুবাদ মেলে না। ঋতুচক্রের আবর্তনে বাংলায় ছটি ঋতুর আবির্ভাব, পশ্চিমে মোটে চারটি। প্রকৃতির রূপ-বর্ণনায় স্পর্শকাতর কবিমনে বিভিন্ন ঋতুতে ভাবের যে বিভিন্নতা দেখা দেয়, পশ্চিমী-মানসে তার দেখা মেলে না প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত ভাবের অভাবে – তাই অনুবাদেও তা গরহাজির! অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে। বাংলা যাঁদের মাতৃভাষা নয়, এমন কিছু প্রকৃত বোদ্ধার ভাল অনুবাদও চোখে পড়েছে বইকি; তা অস্বীকার করলে সত্যের অপলাপ হবে। তবে সংখ্যায় তারা নিতান্তই স্বল্প।

রবীন্দ্রনাথকে বিদেশীদের কাছে পৌঁছে দিতে হলে উৎকৃষ্ট অনুবাদের আশ্রয় নিতেই হবে – নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়। সে-কাজটা আমাদের– আর সেখানে আমরা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ, অন্তত এখনও পর্যন্ত। রবীন্দ্রনাথের নিজের সীমিত-সংখ্যক অনুবাদের ভিত্তিতেই বাঙ্গালি পেয়েছে নোবেলের গৌরব। এর পরে আরও অনুবাদ করে নিজের প্রচার বাড়ানোর জন্যে কবিগুরুর না ছিল সময়, না বাসনা। দেশ-বিদেশের অনুরাগীদের ডাকে সাড়া দিতে কেটে গেছে অনেক দুর্মূল্য সময়। আমাদের সৌভাগ্যক্রমে অন্য আরও অনেক জরুরি কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তিনি।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত

সব ছবি গুলি আন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s