ব্যাঙ্গালোর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ২০১৯ – উদ্বোধনী পর্ব

ব্যাঙ্গালোরের সত্যজিৎ রায় ফিল্ম সমিতি, যাদের আনুষ্ঠানিক নাম Satyajit Ray Film Society Bengaluru (SRFSB), এবারে তাঁদের তৃতীয় বাংলা – কন্নড় ফিল্মোৎসব পালন করলেন জুনের ২১ থেকে ২৩ তারিখ।

সেই অনুষ্ঠান নিয়েই কিছু কথা। আজ রইল প্রথম ও উদ্বোধনী পর্ব। পরের দুই পর্বে থাকবে আরো দুটি দিনের কথা।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনের কথা ছিল গান্ধী ভবনে – বিকেল পাঁচটার সময়। কিছু দেরী হলেও অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল হৈ হৈ করে। সঞ্চালনায় মীর, উপস্থিত ছিলেন সন্দীপ রায়, আদুর গোপালকৃষ্ণন, গিরিশ কাসরাভল্লি এবং নবীন টুলু পরিচালক অনুষ্ঠানের সবচেতে বড় আকর্ষণ ছিল নিঃসন্দেহে আদুর গোপালকৃষ্ণন ও গিরিশ কাসরাভল্লির বক্তব্য। এর আগে সন্দীপ রায়ও উদ্বোধন করে কিছু কথা বলেন। সহজ ভাষায় লেখার চেষ্টা করছি মূল কথা কটি।

সন্দীপ রায় – জানালেন এই ফেস্টিভ্যালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুবই গভীর। এসে গেল গিরিশ কারনাডের প্রসঙ্গ। জানালেন তাঁর বাবার সঙ্গে গিরিশের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। একটি গল্পে অভিনয়ের জন্য যখন গিরিশের সঙ্গে কথা বলা হয়, গিরিশ জানিয়েছিলেন তাঁর জন্য তিন সেট জামাকাপড় রাখতে কারণ তিনি খুবই ঘামেন। কিন্তু একদিনের ঐ শ্যুটিং এ গিরিশের সহ্যশক্তি সত্যিই বিস্ময়কর।

আদুর গোপালকৃষ্ণান –

আদুর জানালেন শুধু তাঁরাই নন, সমগ্র ভারতীয় ফিল্মানুরাগীরাই যে তিন মহারথীর কাছে কৃতজ্ঞ তাঁরা হলেন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেন। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালীর আগে অবধি সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলি ছিল শান্তারামের। তাতে গল্প ছিল, অভিনয় ছিল – কিন্তু বাস্তবের স্পর্শ ছিল না। পথের পাঁচালী যেন ভারতীয় সিনেমাকে প্রথম শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করলো। এরফলে এমন এক উত্তেজনা, অনুপ্রেরণার সৃষ্টি হল যে পরে মৃণাল ও ঋত্বিক চলচ্চিত্র বানাতে অনুপ্রেরণা পেলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক নতুন অধ্যায় শুরু হল।

ইউরোপীয়রা  সত্যজিতের ছবিকে নিও –রিয়ালিজম আখ্যা দেন। সেটা পুরোপুরি ঠিক নয়। যদিও সত্যজিৎ ঐ ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত ছিলেন, তাঁর ছবি একেবারেই ভারতীয় ভাবধারায় নির্মিত।

এরপর তিনি বললেন এই তিন মহারথীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা। ঋত্বিক ঘটক তাঁর শিক্ষক ছিলেন। ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পড়ার সময় আদুর নিজে একটু মুখচোরা ছিলেন বলে ঋত্বিক সম্ভবত তাঁকে লক্ষ করেননি। পরে কোন এক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আদুর সাহস করে একটু এগিয়ে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন যে ঋত্বিক তাঁকে চিনতে পারছেন কিনা। ঋত্বিক মনে করতে পারেননি।

তবে ঋত্বিক পড়ানোর সময় বারে বারে সত্যজিতের সিনেমা দেখাতেন। কোন কোন জায়গায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ছাত্রদের বলতেন – “দেখ, দেখ ভাল করে দেখ। একেই বলে মহান চলচ্চিত্র।”

সত্যজিৎ ও মৃণালের সঙ্গে আদুরের ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই গভীর ছিল। সত্যজিৎ ও মৃণালকে তিনি তাঁর ছবি দেখাতে পেরেছেন। জানালেন তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় আদুর সত্যজিৎকে জানিয়েছিলেন তাঁর সবচেয়ে পছন্দের সিনেমা ‘অপরাজিত’। সত্যজিৎ জানিয়েছিলেন তাড়াহুড়োতে ‘অপরাজিত’র কিছু অংশ ভালো পরিমার্জন করা সম্ভব হয়নি। আদুর প্রায় তাঁকে হাতে ধরে জানিয়েছিলেন – ‘মানিকদা, কিচ্ছু করার দরকার নেই। ঐ ছবি সম্পূর্ণ, ওর একটা ফ্রেমকেও ছুঁয়ে দেখার দরকার নেই।’

আদুর এবার যখন সত্যজিৎকে জিজ্ঞেস করেন তাঁর নিজের ছবির মধ্যে কোনটা সবচেয়ে পছন্দের, সত্যজিৎ নির্দ্বিধায় ‘চারুলতা’র নাম করেন। আদুর জানালেন, তিনি সত্যজিৎকে জানিয়েছিলেন যে ‘চারুলতা’  নিঃসন্দেহে ভালো ছবি, কিন্তু তার চেয়ে অনেক ভালো ছবি সত্যজিৎ বানিয়েছেন।

স্রষ্টা ও তাঁর অনুরাগীর এই আলাপ আমাদের মুগ্ধ করে। সবচেয়ে মজার কথা তিনি বললেন শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে। তিনি শর্মিলার সাদা চুলের ঝলক দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান। তাঁর চোখে তখনো ভাসমান সেই অপুর সংসারের শর্মিলা। শর্মিলাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন চুলে রং করার জন্য। শর্মিলা ও খুবই আশ্চর্য হন এরকম অনুরোধ শুনে।

পরের বক্তা ছিলেন গিরিশ কাসরাভল্লি। তিনি জানালেন, আদুরের মত তিনি সত্যজিৎ ও মৃণালের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে পরিচিত নন। তাঁর বেশী পরিচয় তাঁদের কাজের মধ্যে দিয়েই। অকপট ভাষায় জানালেন যে প্রথমে তিনি যখন ‘অপুর সংসার’ দেখেন, তিনি পছন্দ করেননি কারণ তিনি চরিত্রটিকে ঠিক মতো বুঝতে পারেননি।

পরে এক অনুষ্ঠানে একই দিনে তিনি ট্রিলজি দেখেন। তখন তিনি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেন এই মহান সৃষ্টিকর্মকে। গিরিশ আরো যোগ করলেন প্রাচ্য পাশ্চাত্য ভাবনার তফাৎ। বললেন যে পাশ্চাত্য সভ্যতা শিল্পবিপ্লবকে একেবারে দুহাত আঁকড়ে ধরেছিল। তুলনাতে ভারতে যখন শিল্পবিপ্লবের ঢেউ এল, এখানেও তা গৃহীত হল, কিন্তু একটু সতর্কতার (Caveat) সঙ্গে। ভারতীয়রা কৌতূহলী ও ছিল আবার সেইসঙ্গে সন্দিগ্ধও। এই অপু ট্রিলজি তে ট্রেন শিল্পবিপ্লবের প্রতীক – তার মাধ্যমে এই ব্যাপারটি চমৎকার প্রতিভাত হয়।

পথের পাঁচালীতে আমরা দেখি দুটি শিশু অদম্য আগ্রহ নিয়ে ট্রেনকে কে দেখছে। এক অদ্ভুত বিস্ময়কর ব্যাপার! তারা মুগ্ধ। কিন্তু তখনো তাদের জীবনকে ট্রেন (শিল্পবিপ্লব) সেভাবে প্রভাবিত করেনি।

পরের ছবিতে কিন্তু করেছে। ‘অপরাজিত’তে মা এবং ছেলের জীবনে কিন্তু বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে এই ট্রেনই, যা শিল্পবিপ্লবের প্রতীক। অপু মা’র কথা না শুনে শহরে গেল – কারণ শহর তাকে বেশি আকর্ষণ করেছে। মা ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকে – কবে ছেলে আসবে।

‘অপুর সংসার’ ছবিতে অপুর মা নন, অপু নিজেই থাকে একেবারে ট্রেন লাইনের কাছে। এবার যেন তার কাছে ট্রেন আর আকর্ষণের বস্তু নয়। বরং অপর্ণার মৃত্যুর পর শহরের যান্ত্রিকতা তাকে গ্রাস করতে চায়।

গিরিশের এই বক্তব্য বেশ এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। পুরোপুরি হয়তো একমত হওয়া যাবে না। তবে সত্যজিৎ নিজেই বলেছেন – ‘My years with Apu’ তে –

In both Apu’s earlier two films. ‘Pather Panchali’ and ‘Aparajito’, train had a significant, lyrical role. But I also wanted to highlight a change. Here I will show a city life. But it’s true that train will knit all this three films together.

Tala is a place situated in the north of Kolkata. We could locate a similar house there. There is a small room on the roof top. The rail line is just by the side of the house.  The shunting of locomotive is taking place there. To put it simply, there will be a colorful presence of train throughout this movie.”

আমি নিজেও লিখেছি এই নিয়ে –

https://bhaskarbose.com/2018/12/31/satyajit-the-rail-lover/

সুতরাং এই ভাবনা তে অন্যরকম আলো ফেলার জন্য ধন্যবাদ জানাই গিরিশকে। বেশ কিছু ভাবনার খোরাক তিনি দিলেন।

এর সঙ্গে ছিল অপুর সংসার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রদর্শনী ও অপুর সংসার ছবিটির প্রদর্শন।

2 thoughts on “ব্যাঙ্গালোর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ২০১৯ – উদ্বোধনী পর্ব

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s