‘উত্তম’ আবিষ্কার – প্রথম পর্ব

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে সিনেমা দেখার খুব একটা চল ছিল না। শুধু আমাদের কেন, ষাট – সত্তরের বাঙালী মধ্যবিত্তদের বাড়িতে কিশোর কিশোরীদের একই অবস্থা। তার ওপর আমাদের বাড়ি ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক মফস্বল।

তখন টিভিও ছিল না। পাড়ার টিমটিমে সিনেমা হলে সিনেমা দেখার যোগ্যতা অর্জন করতে হত। মানে সিনেমাকে আমাদের দর্শনযোগ্য হতে হত।

অর্থাৎ ‘বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ’, ‘লোকমাতা নিবেদিতা’, ‘সুভাষচন্দ্র’, ‘বিদ্যাসাগর’ ইত্যাদি। এছাড়া ছোটদের ছবি যেমন, ছোট্ট নায়ক, বাদশা, হাতী মেরে সাথী। ফলে তাঁর মৃত্যুর আগে হলে কতিপয় সিনেমাই দেখেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ’ধন্যি মেয়ে’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, আর ‘অগ্নীশ্বর’।

প্রথমটিতো দারুণ ভালো লেগেছিল, সম্ভবত ফুটবল খেলা ছিল, কাজেই ছোটদের বই,। অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল। যদিও উত্তমের মূল চরিত্র নয়, তাও ঐ পার্শ্ব চরিত্রেই দারুণ লেগেছিল । তবে এখন দেখলে অবশ্য জানিনা, কিরকম লাগবে। জমাটি লেগেছিল সাবিত্রী, পার্থ আর জয়া ভাদুড়িকেও।

সন্ন্যাসী রাজা ভালো লেগেছিল গানের জন্য। পাড়ার বড়রা সবাই বলছিল ‘যীশু খ্রিষ্টে’র মত উত্তমকুমার।  ‘অগ্নীশ্বর’ অনেকেরই খুব ভালো লেগেছিল, আমার একেবারেই লাগেনি। একজন মানবতাবাদী, সৎ, সাহসী, রাগী, অকপট ডাক্তার কেন সারাক্ষণ ঐরকম কপালে ভাঁজ ফেলে, চশমার ফাঁক দিয়ে কথা বলবেন তাও বুঝতে পারিনি। জীবনে এরকম কিছু সৎসাহসীদের সংস্পর্শে এসেছি, তাদের কথা বলা অনেক সোজা সাপটা। এছাড়াও খুব চড়াদাগের সিনেমা বলে মনে হয়েছিল। একটি দৃশ্যই মনে দাগ কেটেছিল, স্ত্রীর গান শুনতে ঘরে ঢুকে বিস্মিত হওয়ার দৃশ্যটি।

আর একটি অন্যধারার ছবি টিভিতে দেখে বেশ লেগেছিল – ‘শেষ অঙ্ক’।

এখনো মনে পড়ে, আমাদের এক স্যর ছিলেন। তিনি পড়াতেন উদ্যানবিদ্যা। একবার আমাদের অমনোযোগী দেখে বলেছিলেন,

 ‘সব মনোযোগ উত্তমকুমারের জন্য? আমরা ‘অধমকুমার’রা খেটে পড়াই, আমাদের কপালই খারাপ।”

সেই মফস্বলী সেলুনেও ‘ইউ’ (U – Uttam) ছাঁট ছিল ভীষণ জনপ্রিয়। বোঝাই যাচ্ছে তিনি প্রায় প্রবাদের পর্যায়ে উঠে গেছিলেন।

উত্তমকুমারের মৃত্যুদিন ২৪শে জুলাই, ১৯৮০। বৃহস্পতিবার। কিন্তু আমি খবর পেয়েছিলাম, শুক্রবার একেবারে ভোরে, শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে। মালদহ থেকে গৌড় এক্সপ্রেসে আসছিলাম, রাতে খবর পাইনি। সেযুগে এত মোবাইল এর চল ছিলনা। কিন্তু সকালে স্টেশনে নেমেই দেখলাম, প্রত্যেক খবরের কাগজেই সেই ছবি, চিরনিদ্রামগ্ন বাংলার সেই প্রবাদ পুরুষ। কাগজ ঘিরে দাঁড়িয়ে বহু লোক। তারপরে শিয়ালদহ থেকে মামারবাড়ি ল্যান্সডাউনে আসতে ও দেখি রাস্তায় রাস্তায় আলোচনা।

মামারবাড়িতে মামাদের অনেকেই ছিলেন উত্তমের বিরাট ভক্ত, বিশেষ করে বড়মামা। মায়ের কাছে শুনেছি পর্দাতে তাঁর আবির্ভাব হলে পরিণত বয়সেও ‘গুরু,গুরু’ বলে চীৎকার করতেন।

তাঁর মৃত্যুতে বিশাল শোকযাত্রা হয়েছিল। সেই শোকযাত্রাতে লরিতে বসা এক অভিনেতার সম্ভবত একটু হাসির রেশ ওলা ছবি এসে গিয়েছিল। ব্যস, তাই নিয়েই হৈ চৈ। পরে আবার তিনি কাগজে বক্তব্য রেখে দুঃখপ্রকাশ করলেন। আবার অল্প বৃষ্টিতে কেউ নাকি ছাতা খুলেছিল। তুমুল চীৎকার – ‘গুরু ভিজবেন, তুমি ছাতা মাথায়?’ ব্যস। তিনিও ভিজলেন। এ যেন সেই ‘রবীন্দ্রনাথ নিজেও ভেজেন, আমাকে ভেজান’

তবে আসল ঘটনা ঘটলো টিভিতে ‘নায়ক’ দেখে। সাদা কালো টিভিতে দেখে দারুণ মুগ্ধ হলাম। পরের দিন ‘দ্য সানডে’ পত্রিকাতে সত্যজিতের লেখা বেরোলো উত্তমকে নিয়ে। পরে সেই লেখাটি বিভিন্ন প্রবন্ধগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  সেই লেখাতে একটি লাইন ছিল মর্মস্পর্শী –

“Uttam was certainly a star in the true Hollywood sense of the term. The ‘question was: was he also an actor?

This is a moot question. There is at least one known instance in Hollywood of an actor with no acting abilities whatever who was propelled into stardom on the strength of the fan mail he received after his first film opened. This was Gregory Peck, who remains to this day, I am told, an actor ‘who needs handling’. But Uttam, even in the most inconsequential of parts, exuded confidence which Peck never did.”

এখনো মনে পড়ে ‘moot’ কথাটির মানে জানতাম না। ডিকশনারি খুলে দেখে নিয়েছিলাম – ‘বিতর্কিত’। সত্যজিতের এই লেখা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। তখনি পাড়ার দাদারা বলেছিল, – “গ্রেগরি পেক’ অভিনেতা নয়? একথা কি করে বলেন?”

কিন্তু একথা অস্বীকার করার জো নেই যে এই স্বীকৃতি পরবর্তীকালে উত্তমচর্চা তে বেশ জোর এনেছিল। বিশেষতঃ সেই যে তিনি বলেছিলেন –

“An artiste, however, must always be judged by his best work. On that basis and within the gamut in which his talent was best revealed, Uttam’s work shows rare virtues of grace, spontaneity and confidence.”

ছবিগুলি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত

আগামী পর্বে সমাপ্য

3 thoughts on “‘উত্তম’ আবিষ্কার – প্রথম পর্ব

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s