বাংলা সাহিত্য-নির্ভর চলচ্চিত্র – ‘আশার হাত বাড়াই’ – দ্বিতীয় পর্ব

[এই লেখার প্রথম পর্বে,  আমরা আলোচনা করেছি, বাংলা সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে দুটি অতি বিখ্যাত কাহিনি অবলম্বনে রচিত ছবি – ‘পরশপাথর’ ও ‘ঝিন্দের বন্দী’ ]

——১—-

সার্থক রূপায়ণ -৩

অযান্ত্রিক

ঋত্বিক ঘটক সত্যজিতের সমসাময়িক।

Ritwik
ঋত্বিক ঘটক

তিনি বাংলার গণনাট্য আন্দোলনেও প্রবলভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে গণনাট্য ভেঙে যাওয়ার পর তিনি পুরোপুরিভাবে চলচ্চিত্র জগতে চলে আসেন। ছবি শুরুর আগে তিনি নাটক লিখেছিলেন, গল্পও লেখেন বেশ কিছু।

Shooting_Azantrik
‘অযান্ত্রিক’ ছবিত শ্যুটিং

       ১৯৪৯ – ৫০ সালে ঋত্বিকের প্রথম ছবির প্রচেষ্টা ছিল তারাশঙ্করের ‘বেদেনী’ কাহিনির ওপর ভিত্তি করে। ছবিটি দুর্ভাগ্যবশতঃ শেষ হয়নি। তাঁর প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ সেই অর্থে দর্শকের কাছে দেখানো হয়নি। তাঁর কতিপয় বন্ধুরাই দেখতে পেয়েছিলেন। এই ছবিটি তৈরী হয় ১৯৫২ সালে, পথের পাঁচালীর আগেই। ঋত্বিক বেশ নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। কিন্তু ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’র আবির্ভাব বাংলা চিত্রজগতের সব হিসেব ওলট পালট করে দিল। ঋত্বিক ছবিটি দেখলেন, একবার নয়, পরপর সাতবার। আবার উৎসাহ পেলেন স্বপ্নপূরণে। এবার নির্বাচন করলেন সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের প্রথম ছোট গল্প, ‘অযান্ত্রিক’।

       সাহিত্যিক হিসেবে সুবোধ ঘোষ প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন চল্লিশ দশকে। বিভিন্ন জীবিকাতে এর আগে তিনি কর্মরত

Subopdh_Ghosh
সুবোধ ঘোষ

ছিলেন। তিনি অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন এবং জনশ্রুতি যে তাঁর গল্প বলার ভঙ্গীটিও ছিল মনোগ্রাহী। বন্ধুদের অনুরোধেই তিনি লেখেন তাঁর প্রথম ছোট গল্প, ‘অযান্ত্রিক’। বাংলা গল্পের ইতিহাসে এই গল্পটি একটি নতুন সম্পর্কের সূচনা করে। গল্পের নামকরণই যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক, বিষয়বস্তুও।

বাংলা সাহিত্যে এর আগে ‘না-মানুষী’ প্রেমের গল্প লেখা হয়েছে, কিন্তু সেই প্রেমের ভাগীদার ছিল জীবজগতের বাসিন্দাই। প্রভাতকুমারের ‘আদরিনী’ ও শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে খুব মর্মস্পর্শী ভাষাতে বিধৃত হয়েছিল হাতি ও গরুর প্রতি তাদের পালকপিতার গভীর অনুরাগ। ‘বলাই’ গল্পে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শুনিয়েছেন একটি বালকের গাছের প্রতি ভালবাসার কথা। কিন্তু একেবারে ‘প্রাণহীন’ একটি গাড়ীর সঙ্গে তার চালকের এত গভীর আত্মীয়তা? এতটাই যে নায়ক বিমল তার পুরনো গাড়ী জগদ্দলের সঙ্গে প্রায় পরমাত্মীয়ের মত ব্যবহার করে! তাকে যত্ন করে, তোয়াজ করে, সাজিয়ে দেয় – শেষে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তার জীবন অর্থহীন হয়ে যায়। প্রায় স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মত গভীরতা এই সম্পর্কের।

       অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এই কাহিনী। কাজেই তার নির্মাণ কাজও সেভাবে হতে হবে। কাহিনীর শুরু এভাবে, –

বিমলের একগুঁয়েমি যেমন অব্যয়, তেমনি অক্ষয় তার ঐ ট্যাক্সিটার পরমায়ু। সাবেক আমলের একটা ফোর্ড, প্রাগৈতিহাসিক গঠন, সর্বাঙ্গে তার একটা দীনতার ছাপ। যে নেহাৎ উপায়হীন বা দায়ে পড়েছে বা জীবনে মোটর দেখেনি, সে ছাড়া আর কেউ ভুলেও বিমলের ট্যাক্সির ছায়া মাড়ায় না।

       কাহিনীর শুরুতেই মাত্র দু- তিনটি বাক্যে দক্ষ কথাসাহিত্যিক নায়ক-নায়িকার সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। গল্পটি খুবই ছোট, এমনকি ছোট গল্পের মাপেও তাকে খুব ছোট বললেও অত্যুক্তি করা হবে না।

       তাঁর ‘ডিটেল সম্পর্কে দু চার কথা’ প্রবন্ধে সত্যজিৎ বলেছিলেন বঙ্কিমের কথা। বিষবৃক্ষ উপন্যাসে নগেন্দ্রের বাড়ীর উঠোনের বিবরণের কথা। “-বঙ্কিম জানতেন যে কাহিনী কাল্পনিক হলেও পাঠকের মনে সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ডিটেলের সাহায্যে তার একটি বাস্তব পটভূমিকা রচনা করে নিতে হয়।” ।

       চলচ্চিত্র বিষয়ে “ডিটেল সম্পর্কে দু-চার কথা” প্রবন্ধে সত্যজিৎ খুব সহজ ভাষাতে আমাদের বুঝিয়েছিলেন যে বিস্তারিত বর্ণনা আমাদের কাছে কাহিনী আর তার চরিত্রগুলিকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য, প্রাণবন্ত করে তোলে। এই ছোট গল্পটিতে প্রথম অনুচ্ছেদ এ আমরা তার পরিচয় পাই।

       এই কাহিনী’র যে ‘নায়িকা’ সেই গাড়ির চমৎকার বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছেন লেখক, –

“তালিমারা হুড, সামনের কাচ ভাঙা, তোবড়ানো বনেট, কালিঝুলি মাখা পর্দা আর চারটে চাকার টায়ার পটি লাগানো; সে এক অপূর্ব শ্রী। পাদানিতে পা দিলে মাড়ানো কুকুরের মতো ক্যাঁচ করে আর্তনাদ করে ওঠে। মোটা তেলের ছাপ লেগে সীটগুলো এত কলঙ্কিত যে, কোন ভদ্রলোককে পায়ে ধরে সাধলেও তাতে বসতে রাজি হবে না। দরজাগুলো বন্ধ করতে বেশ বেগ পেতে হয়, আর যদিও বন্ধ হয় তো তাকে খোলা হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য। সীটের উপর বসলেই উপবেশকের মাথায় আর মুখে লাগবে ওপরের দড়িতে ঝোলানো বিমলের গামছা, নোংরা গোটা দুই গেঞ্জি আর তেলচিটে আলোয়ান।

ajantrik_Car
সেই বিখ্যাত গাড়ী

       কত সহজে অল্প কথায় লেখক আমাদের কাছে বিমল ও তার ট্যাক্সির সম্পর্ককে তুলে ধরলেন। এরপরেতে তিনি সেই সম্পর্কের নানা দিক উন্মোচন করে চললেন। সবশেষে সম্পর্কের ট্র্যাজিক ইতি। এই কাহিনী নিয়ে পুরো মাপের কাহিনীচিত্র করতে গেলে যে পরিমাণ কল্পনাশক্তি, উদ্যম ও সাহসের প্রয়োজন তা সত্যিই অভাবিত। তাই সত্যজিৎ বলেন,

ঋত্বিক বিষয়বস্তু নির্বাচনে একটা অসম সাহসের পরিচয় দিয়েছিল। ঠিক সেই জাতীয় ছবি তার আগে বাংলার চলচ্চিত্র জগতে কেউ করেনি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে নীরস ছবি – নায়ক বলতে একজন গাড়ীর ড্রাইভার আর নায়িকা বলতে বোধহয় সেই গাড়িটাকে বলা চলে। সেখানে সাহসের পরিচয় বলতে একটা ছিল যে সেই গাড়িটার মধ্যে একটা মনুষ্যত্ব আরোপ করার চেষ্টা হয়েছিল, যাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের anthropomorphism-

       এই চলচ্চিত্র সম্পর্কে মৃণালের মনোভাব ও অনুরূপ –“—কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় ছবি অযান্ত্রিক একটি অসাধারণ ছবি এবং ভীষণ ভাল ও মৌলিক ছবি। সম্ভবত তাঁর ছোট্ট জীবনে তুলনারহিত।

       ‘চলচ্চিত্র সাহিত্য ও আমার ছবি’ নিবন্ধে ঋত্বিককুমার ঘটক ‘অযান্ত্রিক’ সম্পর্কে বলেছিলেন – “ঐ এগারো পাতার গল্পটিকে একটি সম্পূর্ণ ছবিতে পরিণত করতে আমাকে নিশ্চয় ভাবতে হয়েছিল। কতখানি সার্থক হয়েছি সেটা আপনারা বলবেন – তবে আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। সুবোধ বাবুর মূল বক্তব্যের প্রতি আমি চেষ্টা করেছি বিশ্বস্ত থাকতে। জানি না কতখানি কৃতকার্য হয়েছি।

       এই বক্তব্যের সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণ একমত। মূল কাহিনীর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন তিনি ছবিটির প্রতিটি পর্বে। গাড়ি ও তার চালকের এই বিরল, অভিনব সম্পর্ক কিভাবে তিনি তুলে ধরবেন দর্শকের কাছে? তাই ছবির শুরু করলেন একটি মজার ঘটনা দিয়ে, হাসি-মজা দিয়েই তিনি সেই দর্শকদের চরিত্রের সঙ্গে অটুট বন্ধনে জড়িয়ে ফেলতে পারবেন । এক মামা-ভাগ্নে প্রায় দায়ে পড়েই শরণাপন্ন হয় বিমল ও জগদ্দলের। সেই যে লেখক বলেছেন, ‘যে নেহাৎ উপায়হীন বা দায়ে পড়েছে’ — মামা –ভাগ্নেও বিপদে পড়েই বিমলের ট্যাক্সির ‘ছায়া মাড়া’তে বাধ্য হয়েছে। প্রথমে গাড়ীর নির্বাচন আর এরপরে তাদের যাত্রার মধ্যে দিয়েই এই তথ্য সুন্দরভাবে পরিচালক ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘মামা-ভাগ্নে’ তার গাড়ির  কোন রকম অমর্যাদা করলেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বিমল। তার হাবভাবে ‘জগদ্দলে’র প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ পায়।

       প্রথমে দেখা যাক গাড়ি স্টার্ট নেওয়া সম্পর্কে লেখকের বিবৃতি –

বিমলের গাড়ির দূর থেকে হর্ন শোনা মাত্র প্রত্যেক রিক্সা সভয়ে রাস্তার শেষ কিনারায় সরে যায়। অতি দুঃসাহসী সাইকেলওয়ালারাও বিমলের ধাবমান গাড়ির পাশ কাটিয়ে যেতে বুক কাঁপে

       এ ঘটনার বর্ণনাতে তিনি উদ্ভাবন করলেন একটি পাগলের প্রতীকী চরিত্র। হর্ন শোনা মাত্রই,  সেই পাগলের কৌতুকী ভাবভঙ্গী দিয়েই দর্শক যেন অনুভব করতে পারেন উপরোক্ত সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া।

       এর পরে গাড়ি চলাকালীন যাত্রীদ্বয়ের সঙ্গে চালকের বাক্যালাপের মাধ্যমে যেন ধীরে ধীরে বিমল ও তার গাড়ীর সম্পর্কের উন্মোচন হয়। বিমলের শুষ্ক, মরুভূমি সদৃশ জীবনে জগদ্দলই একমাত্র ভালবাসা, এটাই যেন তার নিয়তি। ছোটগল্পের এই অন্তর্নিহিত ভাবটিকে পরিস্ফুট করতে পরিচালক সাহায্য নিয়েছেন এক যাত্রী দম্পতির। এই তরুণ-তরুণীও বিমলের গাড়ীর সওয়ার হয়েই তাদের প্রেমের শুরু করে। কিন্তু তা স্থায়ী হয়না। কদিন পরেই বিমল পরিত্যক্তা তরুণীকে আবিষ্কার করে। তার মনে দোলা লাগে, সে চায় মেয়েটির পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু দ্বিধা কাটাতে পারে না। শেষপর্যন্ত সম্পর্ক আর এগোতে পারেনা। হতাশ বিমল ফিরে আসে সেই জগদ্দলের কাছেই। জগদ্দলের সঙ্গে বিমলের গাঁটছড়া যেন এক অদৃশ্য সুতোতে বাঁধা, কিছুতেই তা আর ছিন্ন হতে পারেনা, বিমলের জীবনে ভালোবাসার লোক আর কেউ আসতে পারেনা, – এই নিগূঢ় সত্যটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে এমন এক অণু কাহিনির সাহায্য নিলেন পরিচালক যা একেবারে মোক্ষম। একটি দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই মাটিতে বসে, জগদ্দলের গায়ে হেলান দিয়ে গান গাইছে বিমল। সারা পৃথিবীকে সে যেন জানাতে চায়, তার একমাত্র সাথী, বন্ধু, ভরসা ও আশ্রয়স্থল – জগদ্দল।

ajantrik-Kali
সারা পৃথিবীতে বিমলের একমাত্র আত্মীয় – জগদ্দল

       বিমলের সবকিছু নিঃশেষ করে জগদ্দলকে পুনর্যৌবন দান, প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া, প্রথমে কিছুটা সাফল্য পেলেও  জগদ্দলের আনুষঙ্গিক ব্যর্থতা, বিমলের জগদ্দলের ওপর রাগ, অভিমান আর একেবারে ছবির শেষে জগদ্দলের বলিদান, – সবকিছুতেই আমরা লক্ষ করি পরিচালক অসম্ভব ভাবে অনুসরণ করেছেন সুবোধ ঘোষের মূল গল্পকে। এমনকি সংলাপ রচনাতেও তিনি তাঁর আনুগত্য দেখিয়েছেন মূল স্রষ্টার প্রতি। তবে উপসংহারে তিনি খুব শিল্পসম্মতভাবে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রেখে গেলেন। মূল গল্পটি শেষ হয়েছিল এভাবে,-

জগদ্দলের পাঁজর খুলে পড়ছে একে একে। বিমলের চৈতন্যও থেকে থেকে কোন অন্তহীন নৈঃশব্দের আবর্তে যেন পাক দিয়ে নেমে যাচ্ছে অতলে। তারপরই লঘুভার হয়ে ভেসে উঠছে ওপরে। এরই মাঝে শুনতে পাচ্ছে বিমল, ঠং ঠং ঠকাং ঠকাং, ছিন্নভিন্ন ও মৃত জগদ্দলের জন্য কারা যেন কবর খুঁড়ছে। ঠং ঠং ঠকাং ঠকাং, যেন অনেক কোদাল আর অনেক শাবলের শব্দ।

       ছবিতেও অনুরূপ দৃশ্য থাকে। মৃত জগদ্দলের দেহ বিমলের চোখের সামনেই গরুর গাড়ীতে করে চালান হয়ে যায়। বিমল দাঁড়িয়ে দেখে, পরিপ্রেক্ষিতে থাকে সমাধিস্থল। তার প্রাণ ককিয়ে কেঁদে উঠতে চায়, সঙ্গে দর্শকেরাও প্রায় মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে বিমলের চোখে পড়ে একটি শিশুর হাতে পড়ে থাকা জগদ্দলের হর্নটি, সে খুশীতে তাকে বাজাচ্ছে। শিশুটিকে স্পর্শ করেনি মৃত্যুর, ধ্বংসের মর্মান্তিক করালগ্রাস, সে জীবনের আনন্দে মাতোয়ারা। হর্নটি যেন জগদ্দলের আত্মা, শরীর বিলীন হলেও সে যেন নতুন জীবনের প্রতীক। আত্মা অবিনশ্বর, চিরন্তন,-  “অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো / ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে”। সেই ভারতীয় দর্শনের প্রতিমূর্তি হয়ে খুব আশাব্যঞ্জক ভাবে শেষ হচ্ছে ছবিটি।

       বাংলা ছোটগল্প ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যের যে ‘বর্ষাযাপন’ কবিতাটি প্রায়শই উদ্ধৃত হয়ে থাকে তা নিম্নরূপ :

নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা, /

নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।

অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে /

শেষ হয়ে হইল না শেষ।

       আমাদের মনে হয় ছবির শেষের এই পরিণতি ও যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। সার্থক ছোটগল্পের সার্থক চিত্ররূপের এই অনন্য উদাহরণটি বাংলা চলচ্চিত্রকারদের কাছে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

        ১৯৫৮ সালে মুক্তি লাভ করে অযান্ত্রিক। এবং এদেশে তা একেবারে জনসমাদৃত হয়না। তার কারণ সহজেই অনুমেয়,- তখন দর্শক সেই ছবি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। ‘পথের পাঁচালী’র প্রসঙ্গ এলেও আমরা মনে করব মৃণাল সেন এর কথা, “পথের পাঁচালী জনপ্রিয় ছবি সন্দেহ নেই, কিন্তু ওটি দৈত্যকুলে প্রহ্লাদের মত। অপরাজিত চলেনি একেবারেই, একথা ভুললে চলবে না। চলেনা আরো বহু সৎ ছবি, এদেশে ও বিদেশে

Ajantrik

       এখানে একটি খুব যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন উঠতে পারে। “অযান্ত্রিক” ছবি হিসেবে এদেশে অবহেলিত হলেও গল্প রূপে সাহিত্য জগতে সমাদৃত হল। আবার বিদেশে তা কিন্তু বিশেষভাবে গৃহীত হল।

       সম্ভবত সেইসময়, বাংলা সাহিত্যের পাঠকেরা যতটা পরিশীলিত ছিলেন, সিনেমার দর্শকেরা ততটা নয়। সুতরাং সব নতুন ধারার পরিচালককেই রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে। এটা তাঁদের স্মৃতিচারণ পড়লেই জানা যায়। সুতরাং সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র করতে গেলে শুধু মাধ্যমের তফাৎ নয়, দুই মাধ্যমের দর্শকের বোধ আর অনুভূতির গভীরতার পার্থক্যও বিবেচ্য।

——২—-

সার্থক রূপায়ণ – ৪

ভুবন সোম ও খারিজ

       মৃণাল সেন তাঁর চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন ১৯৫৩ সালে। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাতভোর’ করে তিনি রীতিমতো হতাশই হয়েছিলেন নিজের সম্বন্ধে। চলচ্চিত্রটিকে তিনি সম্পূর্ণ ত্যাগ করেন। ১৯৫৫ সালে নির্মিত পথের পাঁচালীর সাফল্য তাঁর মনে আবার উৎসাহ, উদ্দীপনার জন্ম দিল। তাই আবার ১৯৫৮ সালে তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র “নীল আকাশের নীচে” দিয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন ছবির জগতে। ১০

       সত্যজিতের মত মৃণাল কিন্তু সেভাবে সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্রের জন্য খ্যাত নন। তাঁর যে ছবি কে নতুন চলচ্চিত্রের দিশারী বলা যায় সেই “ভুবন সোম” (১৯৬৯) কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে একটি সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র।

Banful
বনফুল

       বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় পেশায় ডাক্তার। বাংলা সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগই তাঁকে সাহিত্যিক করে তোলে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে বেশ কিছু ডাক্তার। ১৯৫৬ সালে ‘সচিত্র ভারত’ নামে একটি পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যাতে তিনি একটি উপন্যাসোম বড় গল্প লেখেন, “ভুবন সোম।” এই কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র সোম সাহেব একজন আদর্শবাদী সরকারী আমলা। তাঁর জীবনে আদর্শবাদ আর কর্তব্যনিষ্ঠা তাঁকে ভীষণভাবে একাকী করে দিয়েছে। নিজের পুত্রকে ও তিনি কর্তব্যচ্যুতির জন্য সাজা দিতে দ্বিধা করেননি। এই সোম সাহেব একবার বেরিয়ে পড়লেন পাখি শিকারে। সেখানে গিয়ে জীবনের অন্য এক রূপ দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন, আবিষ্কার করলেন সভ্যতার বাইরে এক অন্য ভারতবর্ষকে। সেই আবিষ্কারে তাঁর সাথী হয়েছিল একটি দেহাতী মেয়ে, নাম ‘বৈদেহী’ – যাকে বিদিয়া বলেই সকলে ডাকে। এই বিদিয়া একাধারে যেন রবিঠাকুরের ‘ক্যামেলিয়া’র সেই সাঁওতাল মেয়ে, সেই যে –বেরিয়ে এসে দেখি ক্যামেলিয়া, / সাঁওতাল মেয়ের কানে,/ কালো গালের উপর আলো করেছে। – আবার একই সঙ্গে জীবনানন্দের বনলতা সেন, ‘কূল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা’ সেই ভুবন সোমকে সে ‘দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল’।

Mrinal_Sen
মৃণাল সেন
Book
ভুবন সোম

কাহিনীটি মৃণালের এত হৃদয়গ্রাহী ছিল, তিনি সেটিকে প্রায় আত্মস্থ করে ফেলেছিলেন। তাই হঠাৎ করে মাত্র ঘণ্টা চারেকের মধ্যে যখন তাঁকে একটি খসড়া ছোট চিত্রনাট্য লিখে ফেলতে হয়, এনএফডিসির অফিসে জমা দেওয়ার জন্য তিনি তা করে ফেলতে পেরেছিলেন। সেই কাহিনী তাঁর আত্মজীবনী ‘তৃতীয় ভুবন’ এ নিজেই শুনিয়েছেন মৃণাল। ১১

হিন্দি ভাষাতে নির্মিত সাদা-কালো এই ছবিটি কিন্তু বেশ পথপ্রদর্শকের কাজ করেছিল। এই রকম বিষয়ে মাত্র কয়েকটি একেবারে সহজ সরল দেশজ চরিত্র নিয়ে যে উঁচুমানের চলচ্চিত্র সম্ভব এবং তা জনপ্রিয়তাও লাভ করতে পারে সেটা বোঝা গিয়েছিল। নাম ভূমিকাতে অসামান্য অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত। সেই প্রথম শুরু হল ভরত পুরস্কার আর তিনিই হলেন তাঁর প্রথম প্রাপক। তবে সব্বাইকার মন মাতিয়েছিল গৌরীর (কাহিনীর বিদিয়ার ফিল্মের নাম)  ভূমিকাতে নবাগতা সুহাসিনী মূলে। হাবে-ভাবে, কথা -বার্তায় তিনি একেবারে যেন উঠে এলেন বইয়ের পাতা থেকে। একটি দৃশ্যের কথা আলোচনা করা যেতে পারে, প্রথম যখন গৌরীকে দেখেন সোমসাহেব।

 বনফুল লিখেছিলেন দৃশটিকে এভাবে –

মোষটা আবার দাঁড়িয়ে গেল, ল্যাজটা ঘন ঘন নাড়তে লাগলো খালি।

‘চল তোকে বেঁধে রেখে আসি। মহা পাজী হয়েছিস তুই—‘

মেয়েটা সড়াৎ করে চড়ে পড়ল মোষটার পিঠে। কোন সুদক্ষ ঘোড়সওয়ার অত তাড়াতাড়ি ঘোড়ার পিঠে চড়তে পারতো না।

ভুবন সোম অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন। — মহিষমর্দিনীর কথা চণ্ডীতে পড়েছিলেন, আজ স্বচক্ষে দেখলেন।” ১২

       এত নাটকীয় বর্ণনা, অভিঘাতটিও মোক্ষম। সিনেমাতেও প্রায় অনুরূপ ভাবেই রেখেছেন দৃশ্যটিকে মৃণাল, কারণ একটাই। তাঁর আর লেখকের অনুভূতি এই জায়গায় একসূত্রে মিলে গিয়েছিল। তবে এখানে ক্যামেরার সাহায্যে প্রকৃতির কোলে সে দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা স্বাভাবিক ভাবেই তীব্রতর।

Suhasini1
বিদিয়া
Suhasini2
ভুবন সোম ও বিদিয়া

      আবার কাহিনীর শেষ হচ্ছিল এভাবে, – পনের দিন পরে গৌরীর নামে চিঠি এল তার স্বামীর কাছ থেকে, সব কথা লেখার পর, “পুনশ্চ দিয়ে সখীচাঁদ লিখেছিল, ‘দেবী, একটা সুসংবাদ আছে। ভুবন সোম আমার নামে রিপোর্ট করে নি। শুনলাম, সাহেবগঞ্জে আমাকে বদলী করেছ। ওটা খুব ভালো স্টেশন। অনেক উপরি-’ ”  —  ১৩

       সিনেমার শেষেও একই ভাবে কথকের কণ্ঠস্বরে ভেসে আসে ঐ কথা। কিন্তু তারপরে আমরা দেখি এক অন্য ভুবন সোমকে যিনি জীবনের আনন্দে মাতোয়ারা। গৌরী তাঁকে দেখিয়েছে এক অন্য পৃথিবী, তাঁর দপ্তরের বাইরে এক অনেক অনেক বড় ভারতবর্ষ। সেখানে ‘আকাশের গায় দূরের বলাকা ভেসে যায়’, দেখা যায় ‘পল্লবঘন আম্রকানন’ পল্লীর বধূদের মধুর রূপ আর সর্বোপরি প্রাণোচ্ছ্বলা গৌরী, মহিষমর্দিনী। সম্ভবত এবার তাঁর সেই কুখ্যাত ‘সিনিসিজম’ এর হাত থেকে তিনি মুক্তি পেলেন।

        রমাপদ চৌধুরীর কাহিনী বিন্যাসে আছে বৈচিত্র্যের সম্ভার। তাঁর ‘লালবাঈ’ ঐতিহাসিক উপন্যাস, ‘বনপলাশীর পদাবলী’ গ্রাম বাংলার এক অপরূপ আলেখ্য – ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে র মত উপন্যাসে আমরা দেখেছি দুই প্রজন্মের প্রেমের আশা ও আশাভঙ্গের সংঘাত। তারুণ্যে ভরপুর যুবসমাজের দুটি খুব জীবন্ত আলেখ্য হল ‘এখনই’ ও ‘পিকনিক’। আবার বাস্তব ঘটনা, এক পথিকৃৎ চিকিৎসকের শোচনীয় অবস্থা নিয়ে তাঁর কাহিনী ছিল ‘অভিমন্যু’। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি শারদীয়া পত্রিকাতে পরপর প্রকাশিত তিনটি প্রথম পুরুষের বয়ানে লেখা উপন্যাস খুব আলোড়ন তোলে। এগুলি হল ‘খারিজ’,লজ্জা’ ও ‘হৃদয়’। তিনটি উপন্যাসেই মধ্যবিত্ত বাঙালীর আত্মসমালোচনা দেখা যায়।

Ramapada_Choudhary
রমাপদ চৌধুরী

রমাপদ বাবুর নিজের স্মৃতি থেকে জানা যায় যে ‘লজ্জা’ নিয়ে সিনেমা করার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক, সিনেমাটি না হলেও চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ হয়েছিল। এই তিনটি উপন্যাস প্রথম পুরুষে লেখা, ফলতঃ এগুলির চলচ্চিত্রায়ন বেশ দুরূহ। লেখকের নিজের ভাষ্য রীতিমতো প্রাসঙ্গিক, – “আবার আত্ম-সমালোচনার জন্য উত্তমপুরুষই শ্রেষ্ঠ। —– আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি উত্তমপুরুষে লেখা অনেক বেশী কঠিন যদি না সেটি নিছক কাহিনী বা প্রেমের গপ্পো হয়। — সিনেমা এক জায়গায় বড় দুর্বল, তার উত্তমপুরুষ নেই।” কাজেই উত্তমপুরুষে লেখা কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ রীতিমতো কঠিন কাজ। ১৪

এবার আমরা কাহিনীচিত্রে এই ঘটনাগুলির গতিবিধির আলোচনা করতে পারি।

       লেখকের নিজের কাছেই এই কাহিনী পুরোপুরি আত্ম-সমালোচনার। তা তিনি সম্পন্ন করেছেন উত্তমপুরুষে, আত্মকথনে। চলচ্চিত্রে এই সম্ভাবনা নেই। এই কাহিনীতে সর্বাধিক সমালোচিত সেই দম্পতি, অদিতি ও তার স্বামী অঞ্জন, যাদের বাড়ীতে মৃত চাকরটি কাজ করত। এই সমালোচনার জন্য মৃণাল সিনেমার রীতি মেনে নিয়ে একটি নতুন চরিত্র নিয়ে আসেন, হারান। ছেলেটি পালানের সমবয়সী, যে বাড়ীতে দম্পতি ভাড়া থাকতেন সেখানে সে কাজ করত। পালানের বন্ধু। পালানের মৃত্যুর পর অপরাধে জর্জরিত দম্পতির ওপর পরিচালক যেন কশাঘাত করেন এই বালকভৃত্যের বারংবার উপস্থিতি দিয়ে। হারানকে দেখে দর্শকও যেন অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করে। পালান হারানের বেশে এসে যেন মনে করাচ্ছে যে তার প্রতি অবিচার হয়েছে। সে যখন চা করে নিয়ে আসে, সেই চা খেতেই পারে না অদিতি। তীব্র অপরাধবোধে সে জর্জরিত হয়।

kharij
একটি দৃশ্যে মমতাশঙ্কর ও অঞ্জন দত্ত

       কাহিনী এবং চলচ্চিত্র – দুই জায়গাতেই একটি চরিত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটি পালানের বাবা। কাহিনীতে আছে, পালানের বাবা যখন পালানকে কাজে দিয়ে যায়, পালানের তীব্র অভিমান ছিল বাবার ওপর। বাবা তাকে খাওয়ার জন্য ঘুষের মত করে প্রিয় জিলিপি দিয়ে যায়। কিন্তু অভিমানে পালান তা না খেয়ে লুকিয়ে রেখে দেয়। পালানের বাবার ঠিকানা ও ছিল না তাদের কাছে, রাখার প্রয়োজন ও বোধ করেনি তারা। কিন্তু অন্য বালকভৃত্যের কাছে তা ছিল, সে জানায় দরকার হলে সে তাদের নিয়ে যেতে পারবে পালানের বাড়ি। এই খুব আপাত তুচ্ছ ঘটনার মধ্যে দিয়েই কিন্তু পরিচালক দুই দলের তফাৎ দেখিয়েছেন। এমনকি থানাতে জেরার মুহূর্তেও এমন চমকপ্রদ ঘটনা উঠে আসে। তবে আরো বিস্মিত করে আমাদের উকিলের কথা। তিনি বলেন –“Negligence is also an offence.” স্বাভাবিক ভাবে নিজেকে নিরপরাধ করার প্রচেষ্টায় অঞ্জন জানান যে ঐ ছেলেটি তাদের কাছে বাড়ির ছেলের মতই থাকতো। উকিল একেবারে নির্দ্বিধায় জানা তা হতে পারেনা। তাঁর নিজের কথাতে,-

“আপনারা ওকে ভালবাসতেন, ঐটুকুই। তার বেশী নয়। — আচ্ছা, এই যে কদিন কলকাতার ওপর দিয়ে কোল্ড ওয়েভ বয়ে গেল, কখনো ভেবেছিলেন ওকে একটা বাড়তি কম্বল দিলে ভাল হয়, ভাবেননি।”

Kharij_Film

       প্রশ্নোত্তর পর্বে অসুখের কথাতে অঞ্জনের  ‘ছেলেটি একবার খুব ভুগিয়েছিল পরে শুধরে নিয়ে ‘মানে ভুগেছিল’ – এই সংলাপের মাধ্যমেই পরিচালক তাঁর ভালবাসার অন্তসারশূন্যতা তুলে ধরেছেন। আবার বিপরীত দিকে কাহিনীকে অনুসরণ করেই, এই দম্পতির দিকেও সহানুভূতির দৃষ্টি ফিরিয়েছেন পরিচালক। আগের একটি ছেলে চুরি করে পালানোর জন্য তারা স্বাভাবিক ভাবেই একটু সন্ত্রস্ত ছিলেন, পালানকে তারা তাঁদের বসবার ঘরে শুতে দিতে পারেননি। কাহিনীতে লেখক আত্মকথনে ‘বিশ্বনাথ’ নামের এই ভৃত্যটির চুরিকেই পালানের মৃত্যুর জন্য দাবি করেছেন, নিজেকে সান্ত্বনা দিতে। আবার ছেলেটির মৃত্যুর পর এই দম্পতির বিশেষত অদিতির গভীর মর্মবেদনা আমাদের জানিয়েছে যে তারা তীব্র অনুশোচনাতে দগ্ধ হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী মিলে ছেলেটির বাবাকে তাদের বসবার ঘরে সযত্নে শোবার ব্যবস্থা করে দেয়। বাবা কিন্তু সেখানে শুতে পারে না, সে নিজেও তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। সেও ভাগ নিতে চায় অনুশোচনায়, সে সেখানেই শোবে যেখানে পালান শুত।

       এই কাহিনী এবং চলচ্চিত্রের এটাই বড় সম্পদ – তাদের আঙুল শুধু কোন একটি লোকের দিকে নয়, যেন গোটা সমাজব্যবস্থার দিকে। এই ব্যবস্থা যা বাবাকে বাধ্য করে তার বালক ছেলেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করাতে, যা আর একটি বালকভৃত্যকে বাধ্য করে চুরি করাতে, আবার এক দম্পতিকে সম্ভবত বাধ্য করে তাদের বালকভৃত্য আর শিশুপুত্রের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান গড়ে দিতে।

       কাহিনীর শেষে আমরা দেখি, পালানের দেহ দাহ করার সময় হারান ও তার সমবয়সী বন্ধুরা সমবেত হয় শ্মশানে। তাদের চোখে মুখে ভীতি, আশঙ্কা। তারা যেন বুঝতেও পারছে না কি হতে চলেছে তাদের জীবনে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে তারা পালানের সঙ্গে এক দলে।

             মনে পড়ে এই গ্রন্থের উৎসর্গীকরণে লেখা লেখকের সেই বাক্যবন্ধ – ‘পালান, যেদিন তোরা পড়তে শিখবি’। ১৫

       সেখানে ‘তুই’ এর একবচনের থেকে উঠে এসে ‘তোরা’ র এই বহুবচনের মেশাতে যে ইঙ্গিৎ দিয়েছিলেন লেখক, এই চাক্ষুষ মাধ্যমে পরিচালক তা আমাদের প্রত্যক্ষ করালেন।

       সত্তরের দশকের শেষে মৃণালের পরিচালক জীবনে এক পরিবর্তনের সূচনা লক্ষ করা যায়। ১৯৭৯ সালে ‘একদিন প্রতিদিন দিয়ে তিনি আবার ন্যারেটিভ ফর্মে ফিরে এলেন। ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘চালচিত্র’ – পরপর তিনটি চলচ্চিত্রে তিনি মধ্যবিত্ত, শহুরে বাঙালী জীবনের ফাঁক ফোকর অন্বেষণে ব্যাপৃত হলেন। আসলে তিনি তখন মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কটকেই তীব্র ভাবে তুলে ধরতে চাইছিলেন। এই সময়ের কাজকে তাঁর জীবনের বিশেষ এক পর্যায় বলা যেতে পারে, চতুর্থ পর্যায়। ‘একদিন প্রতিদিন(১৯৭৯) থেকে শুরু করে খারিজ (১৯৮২) ১৬

       উপরোক্ত প্রথম তিনটি চলচ্চিত্রের কাহিনী তাঁর রচনা না হলেও সেগুলি জনমানসে সেভাবে পরিচিত ছিল না। ‘খারিজ’ কিন্তু তা নয়। ১৯৭৪ এ ‘শারদীয়া দেশ’ পত্রিকাতে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তুমুল সাড়া ফেলে পাঠকমহলে। কাজেই মৃণাল সেন যখন সিনেমাটি করবেন জানা গেল, তখনই প্রত্যাশার পারদ চড়তে থাকে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পড়েছিলেন মৃণাল, কিন্তু করে উঠতে পারেননি। স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে তাহলে মনে করতে পারি এই সময় তিনি কোন কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন রমাপদ চৌধুরীর গল্প। তখনই তাঁর মনে পড়ে যায়, উপন্যাসটির কথা। ব্যস! তিনি পেয়ে গেলেন একটি মর্মস্পর্শী কাহিনী যার ওপর তিনি সহজেই নির্ভরশীল হতে পারেন। ঠিক এভাবেই তাঁর পরবর্তী  চলচ্চিত্রের (‘খন্ডহর’) জন্য কাহিনীর খোঁজ করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ফেলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র বিরচিত একটি ছোট গল্প, ঘটনাচক্রে তার নাম ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’। ১৭

             এখানে একটি  মূল প্রতিপাদ্য এসে যায়। সত্যজিৎ রায় বা তপন সিংহের মত ঋত্বিক বা মৃণাল অত বেশী সাহিত্য নির্ভর ছিলেন না। কিন্তু প্রয়োজনে তাঁরাও সাহিত্যের দিকে হাত বাড়াতে দ্বিধা করেননি। তার কারণ একটাই। শিল্পী যেমন তাঁর শিল্পকর্মের জন্য তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা ইতিহাসের বা পরিপার্শ্বের ওপর নির্ভর করতে পারেন, তেমনি নির্ভর করতে পারেন সেই পরিপার্শ্বের, অভিজ্ঞতা বা ইতিহাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কাহিনীর ওপর। শর্ত এটাই যে – কাহিনীটি  তাঁর কাছে হৃদয়গ্রাহী হতে হবে, মনে হতে হবে যে তিনি নিজে এভাবে, এত নিবিড়ভাবে এই মানুষগুলির সুখ, দুঃখ বা আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে পারতেন না।

——৩—-

বিচ্যুতি / তথাকথিত বিচ্যুতি – মতভেদ  – মনান্তর

       তবে এও ঠিক অনেক সময়ই চলচ্চিত্রের রূপায়ণ সাহিত্যিকের বা সাহিত্যানুরাগীর মনের মতন নাও হতে পারে। এমনকি চলচ্চিত্র রূপে তা সফল হলেও। আলোচনা করা যেতে পারে বনফুল রচিত ‘অগ্নীশ্বর অবলম্বনে তাঁর ভাই অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় কৃত চলচ্চিত্রটি। বনফুলের কাহিনী অবলম্বনে মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ চলচ্চিত্রের কথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ও অসামান্য চলচ্চিত্রায়ন ঘটিয়েছেন ‘নিশিপদ্ম’ ও ‘অমর প্রেম’ ছবিটিতে। কিন্তু ‘অগ্নীশ্বর’ কাহিনী হিসেবে খুব স্বতন্ত্র। ডাক্তার অগ্নীশ্বর মুখোপাধ্যায় এক আদর্শবাদী মানুষ। তিনি শুধু ডাক্তার রূপেই খ্যাত নন, প্রশাসক একেবারে সোজা কথায় যাকে বলে দাপুটে মানুষ, বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ানোর মতই কড়া। এইরকম চরিত্রে অভিনয় করতে উত্তমকুমারের মত অভিনেতাকে কেন যে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে কথা বলার মত ম্যানারিজমের আশ্রয় নিতে হল তা বোঝা মুশকিল। এছাড়া কাহিনিতে ‘পঞ্চকন্যা’র উপস্থাপন ছিল খুব বলিষ্ঠ ও অভিনব। চলচ্চিত্রে সেই চরিত্রগুলি খুব লঘু হয়ে গেছে। যে পুলিশের অধিকর্তার বয়ানে কাহিনি রচিত, সিনেমাতে তিনি একটি পার্শ্বচরিত্র হয়ে যাওয়াতে একেবারে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন।  এটা ঠিক, খুব দুরূহ কাজ ছিল এই লেখাটির চলচ্চিত্রায়ন, কাজেই সম্ভবত সেরকম প্রস্তুতি না থাকার ফলে এই বিচ্যুতি।

       সদ্যপ্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজে একজন খুবই ‘রবীন্দ্রমনস্ক’ মানুষ। তাঁর ‘শুভ মহরৎ’ চলচ্চিত্রে খুব সুপ্রযুক্ত একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল। কিন্তু ‘চোখের বালি’ একেবারেই প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পারেনি। এই উপন্যাস প্রসঙ্গে সাহিত্যিক শেখর বসু লিখেছেন,

“মানবচরিত্রের কঠিন সংস্পর্শে এলো ‘চোখের বালি’। গল্প ভেতর থেকে ধাক্কা দিয়েছে মায়ের ঈর্ষায়। সেই ঈর্ষা মহেন্দ্রর রিপুকে ‘কুৎসিত অবকাশ’ দিয়েছে। না হলে এ ভাবে বুঝি দাঁত-নখ বেরিয়ে পড়ত না।

        রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- “নতুন উপন্যাস ঘটনাপরম্পরার বিবরণ দেবে না, তার বদলে সব কিছু বিশ্লেষণ করে ‘আঁতের কথা’ বের করে আনবে।” বাংলা উপন্যাসে এই ধারারই প্রথম সার্থক প্রয়োগ চোখের বালিতে। এই বিক্ষুব্ধ মনোজগতের বিবর্তিত প্রকাশ পরে দেখা গিয়েছে ‘গোরা’, ‘ঘরে-বাইরে’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি উপন্যাসে। ১৮

       কিন্তু পরিচালক চলচ্চিত্রে জৌলুষের মাত্রা বাড়াতে গিয়ে মনোজাগতিক বিশ্লেষণের দিকে মন দেননি। ‘আঁতের কথা’ বের করে’ করে আনার প্রচেষ্টা কম চোখে পড়ে। পরিবর্তে বিনোদিনীর ভূমিকার অভিনেত্রীর পোশাক আর সাজসজ্জার দিকেই মন দিয়ে দর্শকের লঘু মনোরঞ্জনের চেষ্টাই বেশী।

       ফেলুদার কাহিনি অবলম্বনে সন্দীপ রায় যখন ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ করেছিলেন তখন তিনি অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপযোগী করার জন্য পুলক ঘোষালকে জটায়ুর থেকে বয়সে বড় দেখিয়েছিলেন। খুব অনবদ্য প্রয়োগ। কিন্তু ভিক্টর পেরুমলের ভূমিকাতে অভিনেতা নির্বাচন একেবারেই সঠিক হয়নি। ভিক্টরের বিবরণ দিয়েছেন সত্যজিৎ এভাবে, “দ্বিতীয় টোকার শব্দ হতে পুলকবাবুই চেয়ার ছেড়ে ‘এই বোধহয় ভিক্টর’ বলে উঠে গিয়ে দরজা খুললেন। চাবুকের মত শরীরওয়ালা মাঝারি হাইটের একজন লোক ঘরে ঢুকল।“১৯  কিন্তু অভিনয়ে যিনি ছিলেন তাঁকে দেখে একেবারেই ‘চাবুকের মত’ মনে হয়নি। যেহেতু এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, কাহিনীর শেষভাগে ইনি প্রায় নায়কের পর্যায়ে চলে যাবেন, এই ভূমিকাতে উপযুক্ত, মানানসই চেহারার অভিনেতার খুব প্রয়োজন ছিল।

 ——৪—-

লেখক ও পরিচালকের আলোচনা

       লেখক যখন তাঁর নিজের কাহিনীর চলচ্চিত্রায়ন দেখেন, তাঁর প্রত্যাশা কি থাকতে পারে? বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া ঘটনা থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে নিজের কাহিনী অবলম্বনে সত্যজিৎ সৃষ্ট “অরণ্যের দিনরাত্রি” সুনীলের একদমই পছন্দ হয়নি। দূরদর্শনের একটি সাক্ষাৎকারে স্বয়ং সত্যজিৎই জানিয়েছেন সে কথা। অথচ দেশে না হলেও বিদেশে এই কাহিনিচিত্র খুব জনপ্রিয়। খোদ সুনীলকে একবার বিদেশে যাওয়ার সময় ছবিটি নিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা পাঠ্য হবে। সত্যজিৎ এর নিজের খুব প্রিয় এর ভাষা এবং চিত্ররূপ। লিখেছেন, “চিত্রভাষার দিক দিয়ে আমার মতে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি যদিও এ ছবি এদেশে বিশেষ সমাদর পায়নি।২০

      শ্রদ্ধেয় পরিচালক তপন সিংহর অধিকাংশ চলচ্চিত্রই বাংলা সাহিত্যভিত্তিক। একবার মুম্বাইতে কাজ করার সূত্রে তিনি খবর পেলেন, তাঁর বেশ কিছু চলচ্চিত্রের কাহিনিকার তারাশঙ্কর আর নেই। মুম্বাই থেকে কলকাতা ফিরে আরেক সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষকে নিয়ে তারাশঙ্কর সম্পর্কে প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা করেন। বোঝা যায়, কিরকম শ্রদ্ধাশীল হলে এভাবে একজন পরিচালক ভাবতে পারেন। তারাশঙ্করের কাহিনি নিয়ে হাসুলিবাকের উপকথা করে তারাশঙ্করকে খুশি করতে পেরেছিলেন তপনবাবু। তাঁর চলচ্চিত্রায়ণ দেখে খুশী হন লেখক সুবোধ ঘোষও।  ২১

       পরিচালক সত্যজিৎ রায় নিজেও একজন কাহিনীকার। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’ বাংলার কিশোর-কিশোরীদের খুব প্রিয়। কিছুদিন আগেই ফেলুদার পঞ্চাশ বছর পালন হয়েছে তুমুলভাবে।

       ১৯৭৪ সনে তিনি নিজেই যখন ’সোনার কেল্লা’ নিয়ে চলচ্চিত্র করতে উদ্যত হলেন, পাঠক এবং ভাবী দর্শকের উৎসাহ, উদ্দীপনা আর সর্বোপরি প্রত্যাশা ছিল পাহাড়প্রমাণ। চলচ্চিত্রটি আশাতিরিক্ত ভাবে আমাদের মুগ্ধ করল। সত্যজিৎ নিজেই কিন্তু গল্পের খোল নলচে বদলে দিয়েছিলেন। গল্পটি লেখা তোপসের কলমে, উত্তমপুরুষে। সেই রমাপদ বলেছিলেন, সিনেমার দুর্বলতার কথা, ‘তার উত্তমপুরুষ নেই’। তাই স্বাভাবিক ভাবেই পাল্টাতে হল, ছবিটি হল একেবারে অন্য আঙ্গিকে। একেবারে থ্রিলারের ধাঁচে, অপরাধীদের প্রথমেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল, তাদের উদ্দেশ্যও পরিষ্কার। শুরু হল চোর-পুলিশ খেলা, চোরকেও জানিয়ে দেওয়া হল প্রথমেই। পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্থানের ঐতিহাসিক পটভূমি। এমনভাবে দর্শক মুগ্ধ হল যে ‘জয়সলমীর’ আর ‘সোনার কেল্লা’ যেন তীর্থস্থান হয়ে উঠলো বাঙালীর কাছে। এর থেকে সম্ভবতঃ বোঝা যায় যে মাধ্যমের তফাৎ হলে পরিবেশনের তারতম্য কিভাবে ঘটতে পারে বা ঘটা উচিৎ।

——৫—-

চলচ্চিত্রের অবদান সাহিত্যে – ‘তোমারে যা দিয়েছিনু’

       কিছুদিন আগে দূরদর্শনে বাংলা সাহিত্য আর চলচ্চিত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক অন্বেষণের চর্চাতে এক আলোচক খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে বাংলা সাহিত্যও কিন্তু চলচ্চিত্রের দ্বারা উপকৃত। এখন চলচ্চিত্রের ভাষা প্রভাব ফেলেছে সাহিত্যের ওপরে, ফলে তা অনেক প্রাণবন্ত, আধুনিক, এমনকি চিত্রময় হয়েছে। এই কথা নিয়ে অনেক আলোচনা হতেই পারে। তবে একটা ছোট্ট মজার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।

       গত তিন-চার দশক ধরে বাংলা সাহিত্যে তুমুল জনপ্রিয় দুই লেখক হলেন শ্রী শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শ্রী সত্যজিৎ রায়। এঁদের দুজনেরই কিন্তু চলচ্চিত্রের সঙ্গে নাড়ির যোগ। শরদিন্দু প্রথম জীবনে মুম্বাইতে গিয়ে অনেকদিন চিত্রনাট্য লিখেছেন। সত্যজিৎ তো বিশ্ববন্দিত চলচ্চিত্রকার। আমার যুক্তি কে জোরদার করতে একটি নমুনা পেশ করা যাক,

কাহিনী – কুমারসম্ভবের কবি, লেখক – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি বিস্তারিত বর্ণনা,-

উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দির। কৃষ্ণপ্রস্তরনির্মিত মন্দির আকাশে চূড়া তুলিয়াছে; চূড়ার স্বর্ণত্রিশূল দিনান্তের অস্তরাগ অঙ্গে মাখিয়া জ্বলিতেছে। সন্ধ্যারতির শঙ্খঘন্টা ঘোর রবে বাজিতেছে। মন্দিরের বহিরঙ্গনে লোকারণ্য, স্ত্রী পুরুষ সকলে জোড়হস্তে তদগত-মুখে দাঁড়াইয়া আছে। আরতি শেষ হইলে সকলে অঙ্গনে সাষ্টাঙ্গ প্রণত হইল। অঙ্গনের এক কোনে এক বৃদ্ধ প্রণাম শেষ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, যুক্তকরে মন্দিরের পানে চাহিয়া প্রার্থনা করিল – ‘মহাকাল, আয়ু দাও’

অনতিদূরে একটি নারী নতজানু অবস্থায় মন্দির উদ্দেশ করিয়া বলিল – ‘মহাকাল, পুত্র দাও’

বর্মশিরস্ত্রাণধারী এক যোদ্ধা উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল – ‘মহাকাল, বিজয় দাও’

বিনত ভুবনবিজয়িনীনয়না একটি যুবতী লজ্জাজড়িত কন্ঠে বলিল – ‘মহাকাল, মনোমত পতি দাও’

দীনবেশী, শীর্ণমুখ, কালিদাস অবরুদ্ধ কন্ঠে বলিলেন – ‘মহাকাল, বিদ্যা দাও’”   ২২

       লেখাটি কি অসাধারণ প্রাণবন্ত না? মনে হয় না কি, যে যেন আমরা সিনেমা দেখছি। আসলে ব্যাপারটা একেবারেই তাই। এই উপন্যাস রচনার (১৯৫৬) আগেই ‘কালিদাস’ (১৯৫০) চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। সেই চিত্রনাট্যের অংশটি নীচে তুলে দেওয়া হল,

“ডিজলভ।

 উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দির। কৃষ্ণপ্রস্তরনির্মিত মন্দির আকাশে চূড়া তুলিয়াছে; চূড়ার স্বর্ণত্রিশূল দিনান্তের অস্তরাগ অঙ্গে মাখিয়া জ্বলিতেছে। সন্ধ্যারতির শঙ্খঘন্টা ঘোর রবে বাজিতেছে। মন্দিরের বহিরঙ্গনে লোকারণ্য, স্ত্রী পুরুষ সকলে জোড়হস্তে তদগত-মুখে দাঁড়াইয়া আছে। আরতি শেষ হইলে সকলে অঙ্গনে সাষ্টাঙ্গ প্রণত হইল। প্রাঙ্গণের এক কোনে এক বৃদ্ধ প্রণাম শেষ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, যুক্তকরে মন্দিরের পানে চাহিয়া প্রার্থনা করিল –

 বৃদ্ধ – ‘মহাকাল, আয়ু দাও’।

অনতিদূরে একটি নারী নতজানু অবস্থায় মন্দির উদ্দেশ করিয়া কহিল

নারী – ‘মহাকাল, পুত্র দাও’।

বর্মশিরস্ত্রাণধারী এক সৈনিক উঠিয়া দাঁড়াইল

সৈনিক – ‘মহাকাল, বিজয় দাও’।

বিনত ভুবনবিজয়িনীনয়না একটি যুবতী লজ্জাজড়িত কন্ঠে বলিল

যুবতী – ‘মহাকাল, মনোমত পতি দাও’।

দীনবেশী, শীর্ণমুখ, কালিদাস অবরুদ্ধ কন্ঠে বলিলেন –

কালিদাস – ‘মহাকাল, বিদ্যা দাও’।”

ডিজলভ।     ২৩

       খুবই প্রতীয়মান যে শরদিন্দুর ভাষার যে চিত্রময়তা তা অনেকাংশেই তাঁর চিত্রনাট্যে পারদর্শিতার সুফল।

       সত্যজিতের একটি গল্প, ‘বারীন ভৌমিকের ব্যারাম’ এ দেখি, ট্রেনে সাক্ষাৎকারের সময় এক ভদ্রলোককে দেখে খুব চেনা মনে হয়। “ঘন ভুরু, সরু গোঁফ, পমেড দিয়ে পালিশ করা চুল, কপালের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটি আঁচিল। এমুখ তাঁর চেনা, নিশ্চয় চেনা।”  ২৪

        এরকম এক জীবন্ত বিবরণ পাঠ করলেই যেন আমাদের মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ছবি আঁকা হয়ে যায়। যেন ভদ্রলোককে আমরা আমাদের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, ঠিক যেমন উপরোক্ত শরদিন্দু কাহিনিতে দেখেছি উজ্জয়িনীর মন্দিরে প্রার্থনারত কালিদাসকে। আসলে সত্যজিৎ নিঃসন্দেহে হাতে কলম রেখেছেন, কিন্তু তাঁর চোখ রয়ে গেছে ক্যামেরাতে। নিঃসন্দেহে এই চিত্রময় বর্ণনা শরদিন্দু ও সত্যজিৎকে ভীষণভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে, — ছোট, বড় সব পাঠকই তাঁদের ভক্তকুলের মধ্যে ছড়িয়ে আছে।

       পরবর্তী কালেও সাহিত্যিকদের মধ্যে তা অনুপ্রেরণা রূপে কাজ করে থাকবে, সেই সাহিত্যিকরা অনেকেই শরদিন্দু ও সত্যজিতের অনুরাগী। কাজেই একথা বলা যেতে পারে, বাংলা চলচ্চিত্রও আবার কিছুমাত্রায় হলেও সাহিত্যের প্রতি তার ঋণ শোধ করে থাকবে।

——৬—-

‘জানি তুমি অনন্য – আশার হাত বাড়াই’

       প্রাবন্ধিক পবিত্র সরকার লিখছেন, শেষ পর্যন্ত এই কথাটা হয়তো স্বীকার করে নিতে হবে যে, চলচ্চিত্র আর সাহিত্যের মধ্যে একটা ‘অনুবাদ-সম্পর্ক’ চিরকাল থাকবেই। অনুবাদ বলতে আমরা আক্ষরিক অনুবাদ বোঝাচ্ছি না, বোঝাচ্ছি এক ধরনের জন্মান্তর।২৫

       খুব খাঁটি কথা, এক প্রকার নবজন্ম লাভ হয় সাহিত্যকীর্তির। এই জন্মান্তর যদি না ঘটে তাহলে বৃথাই শিল্পীর শিল্পসাধনা। ঐতিহাসিক উপন্যাসে শুধু ইতিহাস থাকেনা, থাকে লেখকের কল্পনাও। ইতিহাসের ও একপ্রকার জন্মান্তর ঘটে ঔপন্যাসিকের হাতে। অনেক চরিত্র এসে যায়, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যেগুলি ইতিহাসে অনুল্লিখিত বা খুব স্বল্প পরিসরেই চিহ্নিত। এইভাবেই সৃষ্ট শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি বা সুনীলের ‘সেইসময়’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ বা ‘প্রথম আলো’ বাংলা সাহিত্যে চিরকালীন আসনের দাবীদার।

       একইভাবে সাহিত্যের নবজন্ম ঘটেছে বাংলা চলচ্চিত্রের হাত ধরে। চলচ্চিত্র কেন সাহিত্যকে অবলম্বন করবে, নিদেন পক্ষে বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে, এ প্রশ্নের উত্তর বারংবার দিয়ে গেছেন বাংলার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকাররা। যে কোন পরিচালক তাঁর সবচেয়ে সুলভ সম্পদকে কখনোই অবহেলা করতে পারেন না। একটি আরো বড় উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রে সঙ্গীত কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা দেখিয়েছেন আমাদের দুই কিংবদন্তী পরিচালক, সত্যজিৎ ও ঋত্বিক। তাঁদের চলচ্চিত্রে বারংবার ব্যবহৃত হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত যা ভারতীয় সঙ্গীতের গর্ব। তার ফলেই তা বিশ্বের অন্যান্য চলচ্চিত্রের থেকে তারা আলাদা।

       পরিশেষে একটি মূল্যবান প্রবন্ধের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তাঁর “সাহিত্য এবং সিনেমা” প্রবন্ধের উপসংহারে সাহিত্যিক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক পূর্ণেন্দু পত্রী খুব প্রণিধানযোগ্য কথা বলেছেন,-

Purnendu
পূর্ণেন্দু পত্রী

“ —-  সাহিত্যের ভাষাকে অন্য মাধ্যমে রূপান্তরিত করার জন্য সবার আগে যা প্রয়োজন তা হলো এমন এক অনুভূতিশীল ব্যক্তিত্বের যিনিসেম কাইন্ড অব পারসেপশনএর যোগ্য এবং যিনি লেখকের অক্ষরের দিকে না তাকিয়ে তাকাবেন তাঁর মূল অভিপ্রায়ের দিকে আর ভাষার অসীম ক্ষমতার প্রমাণ ঘটে তখনই তা শুধু একের কথা অন্যকে জানায় না, অন্যের মধ্যে সঞ্চার করে দেয় অনুভূতির, ধারণার, সৃষ্টির অন্তঃশীল স্পন্দন ২৬

বস্তুতঃ এমন সাহিত্যের অভাব বাংলা সাহিত্যে নেই যা পাঠকরূপী চিত্রপরিচালকের মনে ‘সৃষ্টির অন্তঃশীল স্পন্দন ’ জাগাতে সক্ষম। আর অভাব নেই সেরকম “অনুভূতিশীল ব্যক্তিত্বের যিনি (বা যাঁরা) ‘সেম কাউন্ড অব পারসেপশনএর যোগ্য”।

 সতরাং, আমরা আশা করতেই পারি বর্তমান প্রজন্মের পরিচালকরাও সেই ভাবে স্পন্দিত হবেন। বাংলা সাহিত্যের ওপর নির্চরশীল হতে আদৌ দ্বিধাগ্রস্ত হবেন না, সেই বিখ্যাত গানটির মতই,  –

“হয়তো তোমারি জন্য

হয়েছি প্রেমে যে বন্য,

 জানি তুমি অনন্য,

 আশার হাত বাড়াই।”

তথ্যসূচীঃ

 

১ – গল্পসমগ্র ১ – সুবোধ ঘোষ – আনন্দ, প্রথম সংস্করণ, অষ্টম মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর – ২০১১, পৃ =৪৫১

২ – বিষয় চলচ্চিত্র –সত্যজিৎ রায়,  অষ্টম মুদ্রণ, আনন্দ, সেপ্টেম্বর – ২০০৯ – পৃ =৫৯

৩ – গল্পসমগ্র ১ – সুবোধ ঘোষ – আনন্দ, প্রথম সংস্করণ, অষ্টম মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর – ২০১১, পৃ =৪৫১

৪ – ঋত্বিক, সত্যজিৎ রায়, সেই ঋত্বিক, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত, প্রতিভাস, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর, ১৯৮৫ – পৃ = ৪০

৫ – তৃতীয় ভুবন, মৃণাল সেন, প্রথম সংস্করণ, তৃতীয় মুদ্রণ, আনন্দ, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ – পৃ = ৩২

৬ – চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু – ঋত্বিক কুমার ঘটক , দেজ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ, নভেম্বর ২০১৫, পৃঃ ১৬৫-১৬৬

৭ – গল্পসমগ্র ১ – সুবোধ ঘোষ – আনন্দ, প্রথম সংস্করণ, অষ্টম মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর – ২০১১, পৃ =৪৫১

৮ – গল্পসমগ্র ১ – সুবোধ ঘোষ – আনন্দ, প্রথম সংস্করণ, অষ্টম মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর – ২০১১, পৃ =৪৫৫

৯ – চলচ্চিত্র, ভূত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, মৃণাল সেন, সপ্তর্ষি প্রকাশন, ২০১২  পৃ =৩৫

১০ – তৃতীয় ভুবন, মৃণাল সেন, প্রথম সংস্করণ, তৃতীয় মুদ্রণ, আনন্দ, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ – পৃ = ৩০ – ৩১

১১ – তৃতীয় ভুবন, মৃণাল সেন, প্রথম সংস্করণ, তৃতীয় মুদ্রণ, আনন্দ, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ – পৃ = ৮৪ – ৮৫

১২ – ভুবন সোম, বনফুল, প্রথম বাণীশিল্প সংস্করণ, এপ্রিল, ২০০৬, পৃ = ৭৮

১৩ – ভুবন সোম, বনফুল, প্রথম বাণীশিল্প সংস্করণ, এপ্রিল, ২০০৬, পৃ = ১০৭ – ১০৮

১৪ – উপন্যাস সমগ্র, রমাপদ চৌধুরী, প্রথম খণ্ড, সপ্তর্ষি প্রকাশন, জানুয়ারি – ১৯৯৬, পৃ = ৪৩৫

১৫ – খারিজ, রমাপদ চৌধুরী,  প্রথম সংস্করণ, তৃতীয় মুদ্রণ, আনন্দ, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ – পৃ = ৩০ – ৩২

১৬ – শতবর্ষে চলচ্চিত্র (২) –নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত, আনন্দ, প্রথম সংস্করণ, পঞ্চম মুদ্রণ, মে – ২০১৪ – পৃ = ৪৬৩

১৭ – তৃতীয় ভুবন, মৃণাল সেন, প্রথম সংস্করণ, তৃতীয় মুদ্রণ, আনন্দ, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ – পৃ = ১৮৯ – ১৯০

১৮ –  http://www.abasar.net/unibibidh_lit_chokherbali.htm

১৯ –  ফেলুদা সমগ্র, সত্যজিৎ রায়, প্রথম খণ্ড, আনন্দ, ষষ্ঠ মুদ্রণ, নভেম্বর ২০০৯, পৃঃ – ৫২২

২০ – বিষয়  চলচ্চিত্র, সত্যজিৎ রায়,  – অষ্টম মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর – ২০০৯ – পৃ = ১২৭

২১ – মনে পড়ে, তপন সিংহ, আনন্দ, প্রথম সংস্করণ, পঞ্চম মুদ্রণ, ২০১৪

২২ – শরদিন্দু অমনিবাস, তৃতীয় খণ্ড, আনন্দ, অষ্টম মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১– পৃ = ৩৯৫ – ৩৯৬

২৩ – শরদিন্দু অমনিবাস, নবম খণ্ড, আনন্দ, তৃতীয় মুদ্রণ, অক্টোবর, ১৯৮১– পৃ = ১৯০

২৪ – আরো এক ডজন, সত্যজিৎ রায়, মুদ্রণ,  আনন্দ, উনবিংশ মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০০২  পৃ = ১০৬

২৫ – শতবর্ষে চলচ্চিত্র –নির্মাল্য (১) আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত, আনন্দ, প্রথম সংস্করণ, পঞ্চম মুদ্রণ, মে – ২০১৪ – পৃ = ১৬৪

২৬ – সিনেমা সংক্রান্ত, পূর্ণেন্দু পত্রী, দেজ পাবলিশার্শ, জুলাই, ২০০৫  পৃ = ২৪

 

সমস্ত ছবিগুলিই ইন্টারনেট থেকে নেওয়া

 

10 thoughts on “বাংলা সাহিত্য-নির্ভর চলচ্চিত্র – ‘আশার হাত বাড়াই’ – দ্বিতীয় পর্ব

  1. বাংলায় ছায়াছবি নিয়ে যখন আলোচনা হয়, একটা প্রবণতা সুলভ থাকে। যাকে বলে ‘রাইটিং বিটুইন দ্য লাইনস’। এর ভালোমন্দ নিয়ে মন্তব্য করবো না। তবে লেখকের নিজস্ব ধারণার চাপ আলোচনার উপর যখন চেপে বসে, তা পাঠক বা দর্শকের জন্য কিঞ্চিৎ বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ায়। ভাস্কর বসু কৃত চিত্র-আলোচনার দুই কিস্তি লেখাটি সেই পিছুটান মুক্ত। সহজ ও মসৃণ বর্ণনার মাধ্যমে সাহিত্য ও চিত্র উভয়ের প্রতিই গ্রহীতার আগ্রহ ধরে রাখার এলেম তাঁর আছে। এটা একটা বড়ো কথা।

    Liked by 1 person

  2. ব্যাপক লেখা ভাস্করদা। তবে আমার একটা দাবি আছে। রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনির ক্ষেত্রে মূল সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের সময় কী-কী পরিবর্তন হয়ে থাকে, আর তার কতটা যুক্তিসঙ্গত, কতটা খেয়ালখুশিমাফিক, সেটা নিয়েও একটা আলাদা লেখা হলে বড়ো ভালো হয়।
    উত্তরের, এবং এই নিয়ে একটা মেগা-ক্যালিবার পোস্টের অপেক্ষায় রইলাম।

    Liked by 1 person

    1. এটা ঠিকই। যেমন ধরা যাক ব্যোমকেশ এবং ফেলুদার ক্ষেত্রে। এটা প্রায় গবেষণার বিষয়বস্তু। আরো একটা ব্যাপার আছে, সেটা হচ্ছে ভ্রমণকাহিনী ঢ় চলচ্চিত্রায়ণ সম্পর্কেও।

      Like

      1. ঋজু
        সত্যজিৎ ও ফেলুদা নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে রইল।

        Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s